আইইউসিএন প্রতিবেদন: সময় থাকতেই ব্যবস্থা নিতে হবে

  • ১৭-Jun-২০১৯ ০৯:৫১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশেরই একক কোনো সম্পদ নয়, এটা আজ বৈশ্বিক সম্পদ। সুন্দরবনের যে প্রাকৃতিক ও প্রাণবৈচিত্র্য সেটাই বাংলাদেশের জন্য এ সম্মান বয়ে এনেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য জৈব সম্পদ। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় গর্বও। শুধু তা-ই নয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিপরীতে এটা দক্ষিণাঞ্চলের পরীক্ষিত রক্ষাকবচ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু পৃথিবীর একক বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনটি আজ মনুষ্য সৃষ্ট বিপদের সম্মুখীন। যেকারণে সম্প্রতি এটিকে বিপদাপন্ন বিশ্বঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে ইউনেস্কোকে সুপারিশ করেছে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেটিভ অব নেচার (আইইউসিএন)। আগামী ৩০ জুন থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিতব্য ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবিষয়ক সম্মেলনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গত ৭ জুন আইইউসিএন তাদের ওয়েবসাইটে সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইইউসিএন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে আইইউসিএন-ইউনেস্কোর যৌথ মিশনের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় লোনাপানির বন ও বেঙ্গল টাইগারের অভয়ারণ্য সুন্দরবনের ৬৫ কিলোমিটার দূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ বন্ধ করে তা সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছিল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। কিন্তু তার পরও সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা না করেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ওই এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে ১৫০টি শিল্প প্রকল্প। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের কাছে পায়রা নদীর তীরে আরও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। এটা ঠিক যে, দেশে-বিদেশের পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করার পরও প্রথম থেকেই সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের ‘মুই কী হনুরে’ ভাব লক্ষণীয়। যেন তারা সবাই মূর্খ, তারা কেউ বিশে^র সেরা বিশ^বিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী নয়। তাদের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কোনো পড়াশোনা নেই। শুধু সরকারের লোকজনেরই আছে। কিন্তু একটা বিষয়ে পড়াশোনা দুটো পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হতে পারে না। অন্তত মাঝামাঝি তো হবে। সেটা হলেও তো পরিবেশবাদীদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু সরকার সেটাই করে যাচ্ছে না তো! আমরা মনে করি, ইতোমধ্যেই অনেক সময় চলে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কাজেই যথাসময় ব্যবস্থা না নিলে বন্যপ্রাণী, মাছ, সন্দরবনের গাছপালা সবই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এ বলাই বাহুল্য। 

ইতোমধ্যেই স্বল্পমেয়াদি নানা ধরনের ক্ষতি দেখা দিয়েছে। আর এতেই আন্দাজ করা যায়, দীর্ঘমেয়াদি কী ক্ষতি হতে পারে। যা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু উট পাখির স্বভাব এমনই যে, ঝড়ের আশঙ্কাকালে তার কিছুই হবে না ভেবে সে বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবে, তবুও নিরাপদ আশ্রয়ে যাবে না।  তবে আমরা আশা করি, সরকার সেরকম উটপাখিরূপ হবে না।  সুন্দরবনকে রক্ষার দ্রুত সব রকম ব্যবস্থা নেবে। যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে বাঁচাতেই হবে। বারবার বলা দরকার যে, সুন্দরবন মানে নিছক কিছু গাছপালা আর পশুপাখি নয়। তাই সুন্দরবন ধ্বংস মানে শুধু বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়, বরং প্রকারান্তরে এ বনের ওপর ফি বছর লাখ লাখ মানুষের জীবিকার বিনাশ, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ মানুষকেও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। কাজেই সরকার যদি প্রকৃতই জনগণের জন্য হয়ে থাকে আশা করি এই জনগণকে তেমন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে না। লাখ লাখ মানুষের জীবনজীবিকার বিনাশের কুশিলব হবে না। 

Ads
Ads