জগলুল হায়দারের টর্চার সেলে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে: ভারত পালিয়েছে ২৫ পরিবার

  • ১৫-Jun-২০১৯ ০৯:১১ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

বাংলাদেশে সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ মোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে সবচে আলোচিত, সমালোচিত এমপির তালিকা করতে গেলে সবার আগে যে নামটি চোখে ভেসে উঠবে তিনি হচ্ছেন সাতক্ষীরা ৪ আসনের এমপি জগলুল হায়দার। নানা ধরণের আঁতলামি করে দৃষ্টি আকর্ষণের বৃথা চেষ্টা করা জগলুল হায়দারের কর্মকাণ্ডে তার সহকর্মী অনেক এমপিকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। একজন এমপি হিসাবে মাটি ও মানুষের সঙ্গে কাজ করা মানে তার সঙ্গে রাস্তায় নেমে কোদাল দিয়ে নিয়মিত মাটি কাটা নয়। কারণ মাটি কাটার জন্য শ্রমিক রয়েছে। শ্রমিকদের কাজে বারবার ভাগ বসিয়ে,  আইন প্রণেতা হিসাবে নিজের প্রকৃত কাজটিই ভুলে গেছেন এমপি জগলুল। 

এমনকি লোক দেখানো কম্বল বিতরণ, গরিবের বাড়িতে বাজার করে নিয়ে গিয়ে সেটি ভিডিও করে ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য  এমপিদের কাছে হাস্যরসের কৌতুক অভিনেতা গোপাল ভাঁড়ের নতুন সংস্করণ হিসাবে ইতিমধ্যেই নিজেকের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এছাড়া একজন এমপি হয়েও তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের সামনে ফ্লোরে বসে নিজের ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি বা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার অবমাননা করেছেন বলেও মনে করেন একাধিক এমপি। শেখ হাসিনার পরিবারের একজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম ভাঙিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করলেও গোপনে নিজের আপন ভাইকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ  এবং তারেক রহমানের গোপন মিশন বাস্তবায়ন করছেন  বলে জানা গেছে। তারেক রহমানের নির্দেশেই গত ১০ বছর ধরে সাতক্ষীরা শ্যামনগর -কালীগঞ্জ (একাংশ) এলাকায় সংখ্যালুঘ নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন জগলুল হায়দার এবং তার পরিবারের সদস্যরা। এমপি জগলুল হায়দারের নানা দুর্নীতি, অপকর্ম এবং গোপন মিশন  নিয়ে ভোরের পাতার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্যামনগর উপেজলা সদর থেকে গত এক বছরের কম সময়ে কমপক্ষে ২৫ টি পরিবার এমপি জগলুল হায়দার ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এমপি জগলুলের নিজের মেজ ছেলে রাজীব হায়দারের নেতৃত্বে তার বাড়ির নিচ তলায় ‘বিশেষ টর্চার সেল’ গঠন করে সেখানে সম্মানিত হিন্দুদের বেদম প্রহার ও হিন্দু পরিবারের সুন্দরী মেয়েদের ধর্ষণ করার ভয় দেখিয়ে এ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন বলে জানিয়েছ জগলুল হায়দারের পরিবারেরেই একজন ঘনিষ্ঠ সদস্য। 

জগলুল হায়দারের হয়ে চাঁদাবাজি ও সুন্দরবন্দের দস্যুদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের দায়িত্বে থাকা বিশস্ত লোকটি ভোরের পাতার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ‘এমপি সাহেবের কথায় আমরা অনেক অপকর্ম করি। কিন্তু আমার পরিবারের সঙ্গে বেঈমানি করেছেন এমপি ও তার পরিবারের লোকজন। তার জন্য কত লোককে যে পিটিয়েছি, হাত পা ভেঙে দিয়েছি তার হিসাব নেই। কিন্তু এমপি সাহেবের বউ আমার ছেলেকে একটা চাকরি দেন নাই। আমি টাকাও দিয়েছিলাম ৩ লাখ এমপি সাহেবের কথায়। কিন্তু আমার ছেলের চাকরি হয়নি।’

সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে এ প্রতিবেদকে জগলুলের বিশস্ত লোকটি বলেন, কয়েকদিন আগেও জগলুল হায়দারের ছেলে শ্যামনগরের ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ হিন্দু পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন করেছে। শুধু মাথা ফাটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পরও তার ছেলেকে শুধু হিন্দু বলে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছিল এবং এমপি জগলুলের মেজ ছেলে রাজীব নিজ হাতে তাকে মেরেছিল। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে চিঠিও লিখেছিলেন গত মাসের ১৩ মে তারিখে। কিন্তু এমপি জগলুল আগে থেকেই জেনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দপ্তর ও গণভবনে সেই চিঠিটি যেন না পৌঁছাতে পারে সে কাজটি গোপনে সেরে ফেলেন। এক্ষেত্রে তিনি অর্থও খরচ করেছেন বলে জানিয়েছেন জগলুল হায়দারের ঘনিষ্ঠ এক আত্নীয়। যে আত্নীয়ের মাধ্যমেই সকল অবৈধ কাজের টাকা পয়সা লেনদেন করান এমপি জগলুল। 

উল্লেখ্য, এমপি জগলুল হায়দারের ছেলের নির্যাতনের বিষয়ে মামলাও করতে পারেননি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের পরিক্ষিত অসহায় হিন্দু পরিবারটি। এখন মাথায় রক্ত জমে থাকা আহত ছেলেটিকে ভারতের বেঙ্গালুরে  একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১৫ লাখ টাকা সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসা করতে হচ্ছে। এরপর পরিবারের সদস্যদের ওপর তো হত্যার প্রচ্ছন্ন হুমকি থেকে শুরু করে নারীদের ধর্ষণ করিয়ে দেশছাড়া করার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। এমপির লোকজন প্রায় রাতেই বাড়ির আশেপাশে এসে মহড়া দিয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগের সত্যতার কথা জানিয়েছেন মহড়ায় অংশ নেয়া উপজেলা ছাত্রলীগে পদ না পাওয়া জগলুল হায়দারের মাদকাসক্ত এক ক্যাডার। 

ভোরের পাতার নিজস্ব অনুসন্ধান এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ বছরে কমপক্ষে শতাধিক পরিবারকে নির্যাতন করে দেশছাড়া করেছে এমপি জগলুল হায়দার। সম্মানের ভয়ে অনেকেই দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেশ ছেড়ে ভারত যাননি, তারাই এখন এমপি জগলুলের অত্যাচারে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। আতংকিত হিন্দু পরিবারের সদস্যরা বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন, সুষ্ঠু তদন্ত করে এমপি জগলুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। 

এদিকে, ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের পাতাকে নিশ্চিত করেছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনে বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন এমপি জড়িত, এমন তথ্য আমাদের কাছেও এসেছে। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সেটি নিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনে আওয়ামী লীগ সরকারই ব্যবস্থা নিলে খুশি হবে ভারত। তবে ভারতে যেন নতুন করে কোনো বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেদিক বিবেচনায় যদি কোনো নির্যাচিত হাই কমিশনে লিখিত আকারে জানান তবে আমরা অবশ্যই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। কেননা বাংলাদেশ-ভারতের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ঠিক রাখতে নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষগুলোর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবেই। তা না করা গেলে দুই দেশের জন্যই অমঙ্গলজনক হবে বিষয়টা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ হিন্দু থাকলেও বর্তমানে সেটি ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ভারত সরকার খুব করে চায় বাংলাদেশে শুধু হিন্দু নয়, সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা বজায় থাকুক এবং বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। সেখানে কোনো এমপি যদি পাকিস্তান আদর্শের গুপ্তচর হয়ে কাজ করেন তাহলে তার বিষয়ে আমাদের আরো খোঁজ খবর নিতে হবে। 

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জগলুল হায়দারকে শনিবার সন্ধ্যায় ভোরের পাতার টেলিফোন থেকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি আমার জানা নেই। এ প্রতিবেদকের কাছে তথ্য প্রমাণ রয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে এমপি জগলুল উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনার যা ইচ্ছে লিখে দেন।  আপনি আমার সম্মানহানি করছেন। আমি আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এই কথা বলেই ফোন কেটে দেন জগলুল হায়দার।

Ads
Ads