ব্যাংক খাতের তুঘলকি কাণ্ড: ছাড়াল খেলাপি ঋণ লাখো কোটি টাকা!

  • ১২-Jun-২০১৯ ০৯:৪৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না ঋণখেলাপিদের রেসের পাগলা ঘোড়া। এবার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অবলোপনের হিসাব বাদেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখো কোটি টাকা ছাড়াল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ- এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকায়। তবে অবলোপনসহ এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি। জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সব মিলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। 

কিন্তু ঋণখেলাপি রোধে যেখানে সরকারের শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সেটা না করে বরং বারবার ঋণখেলাপিদের বিশেষ ছাড় দিয়েই যাচ্ছে। ঋণখেলাপিদের অনুকূলে এ যেন এক মগের মুল্লুক আর কি। আর এরই ফলে ঋণখেলাপিরা আরও বেশি করে ঋণখেলাপি হওয়ার পথ করে নিচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, আজ বাংলাদেশে জাতীয় সমস্যাগুলোর অন্যতম প্রধান হচ্ছে এই ব্যাংক খাতের ‘খেলাপি ঋণ সমস্যা।’ এখন সেই সমস্যা না কাটিয়ে যদি বারবার আরও বিশেষ ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তো এই সমস্যা শুধু জাতীয় সমস্যই নয়, চিরকালীন এক জেনিটিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আর তাই তো গত তিন দশকে খেলাপি ঋণের অঙ্ক জ্যামিতিকহারে বেড়েই চলেছে। আর তারই পরিণামে আজকে ঋণখেলাপির পরিমাণ সর্বসাকুল্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা হলো। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এ চিত্র বাস্তবিকই দুশ্চিন্তার। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, খেলাপি ঋণের এই রেসের পাগলা ঘোড়া কি কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়? 

আমরা জানি, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা, এ টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি যে ব্যাংক থেকেই ঋণ নেওয়া হোক না কেন, ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে। ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, তিন মাসেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। কেন তবে ব্যাংক খাতের এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটল? এখন এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়াতেই অনেকেই ঋণ পরিশোধ কমিয়ে দিয়েছেন। আর তারা ওই সুবিধা নিতে গিয়েই এমন ঋণখেলাপি হয়েছেন।

এখন এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, এই মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। ফলে পিছিয়ে পড়ছেন ভালো উদ্যোক্তারা। বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। কাজেই ঋণখেলাপিদের জন্য আর কোনো ছাড় নয়। এখন থেকে যে কোনো মূল্যে হোক, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালীরা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। এটা যেন আর না হয়। কেননা আমরা দেখেছি, এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসেনি, বরং তাতে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও প্রলম্বিত হয়েছে। ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ব্যাংকিং খাত।

অথচ আমরা দেখেছি যে, ২০১২ সালে ঋণ নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ঋণখেলাপিরা বাদ সাধায় সেই নীতি থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত ঋণখেলাপিদের ২০১৪ সাল থেকে টানা ছাড় দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়ম শিথিল করে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও সুদ মওকুফ সুবিধা দেওয়ার পরও গত বছরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ২৬ শতাংশ বা ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। আগের বছরে যা ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। কাজেই এ খাত তথা সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থে এমন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে, যার মাধ্যমে ভালো গ্রাহকরা হবেন পুরস্কৃত এবং খারাপ গ্রাহক তথা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা হবেন তিরস্কৃত ও দ-িত। তাছাড়া ঋণ প্রদান ও আদায়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বন্ধ করতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা। 

কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দেয়। অথচ খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য আদায়ের পরিবর্তে নীতি পরিবর্তন করে ছাড়ের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমরা দেখেছি ২০১৫ সালে ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়। তবে সেই সময় দুটি গ্রুপ ছাড়া আর কেউ টাকা পরিশোধ করেনি। অর্থাৎ সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে যে ফল মেলে না, তা প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য ও দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করতে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সরকারের অন্যান্য সাফল্যের ওপর সবচেয়ে বেশি কালি লেপে দিচ্ছে ব্যাংক খাতের এ খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যে ঋণের বোঝা মূলত জাতিকেই যুগ যুগ ধরে বইতে হয়। কিন্তু জাতি কেন এই ঋণখেলাপিদের ঋণের বোঝা বইতে যাবে? 

Ads
Ads