ইসলামে রাজনীতি: বিবেকবানদের বোধোদয়

  • ২-Jun-২০১৯ ০৮:৫৪ অপরাহ্ন
Ads

:: কাজী এম এ আনোয়ার ::

রাজনীতি

১. ইসলামী রাজনীতি কিংবা ইসলামিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে রাজনীতির আধুনিক সংঙ্গা ও প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা প্রয়োজন। রাজনীতি হলো এমন নীতি বা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং যার মাধ্যমে একটা রাষ্ট্রে ওই গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন হয়। প্লেটো ও এরিস্টটলের মতে রাজনীতর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ কল্যাণ, সামাজিক শুভবোধ ও নৈতিক পূর্ণতা সাধন।

এরিস্টটলের মতে ‘রাষ্টবিজ্ঞানের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন। এরিস্টটল তার ‘পলিটিক্স’ বইয়ে বলেন, রাজনীতি হচ্ছে সামাজিক অস্তিত্বের পূর্ব শর্ত, অর্থাৎ এই রাজনৈতিক সম্পর্কটাই প্রাকৃতিক ভাবেই গড়ে ওঠে এবং প্রতিটি জনগণই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মানুষ সবসময়ই নিজের সামাজিক অবস্থান তৈরি করে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ও সমাজের সম্পদের সঠিক বণ্টনের অংশ নিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে নিজের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে পক্রিয়াকে মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করে তাই রাজনীতি। সুতরাং রাজনীতি একজন নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য কারণ কেবল রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকের মধ্যে নৈতিক গুণাবলির প্রসার ঘটানো সম্ভব।
 
২.  রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট-এ ডাহল এরিস্টটলের রাজনীতির সংজ্ঞাকে খুব সংকীর্ণ মনে করে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন, রাজনীতি একধরনের অনঢ় মানবিক সম্পর্কের প্রকৃতি যা লক্ষণীয়ভাবে ক্ষমতা, শাসন বা কর্তৃত্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। কারো কারো মতে রাজনীতি হল কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যা একটি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের জন্য যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এক কথায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব যেখানে অবশ্যম্ভাবী সেক্ষেত্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে যে প্রতিযোগিতার সূচনা হয় তাই রাজনীতি। ধর্মীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম ছাড়া আর কোনো ধর্মে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার স্বংসম্পূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করা হয়নি। তাই আধুনিক রাজনীতি ও ইসলামিক রাজনীতির প্রয়োগ একই কথা না, কারণ আধুনিক রাজনীতির মূলমন্ত্র মানব রচিত আর ইসলামিক রাজনীতি ঐশীবাণী নির্দেশিত। আধুনিক রাজনীতির রূপ ও কাঠামো নির্ভর করে একটা দেশের আর্থ-সামাজির কাঠামোর উপর। যেমন পুঁজিবাদি-আর্থ সামাজিক কাঠামোর রাজনৈতিক কাঠামোতে পুঁজিবাদির ধারক বাহকরাই রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। আবার সামন্তবাদি আর্থসামাজিক রাজনৈতিক কাঠামোতে রাজতন্ত্র ভিত্তিক রাজনীতি সূচিত হয়। এছাড়া সমাজতন্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো একনায়কত্ব ভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে। 

ধর্ম ও রাজনীতি:

৩. এখন প্রশ্ন হল, ধর্ম কি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। পৃথিবীতে অনেক ধর্ম ও বিশ্বাসের অস্থিত্ব আছে এবং প্রতিটি ধর্মের অনুসারিরা স্বস্ব ধর্মের অনুশাসন মেনেই ব্যক্তিগত,পারিবারিক ও সামাজিক কার্য পরিচালনা করতে চেষ্টা করে। তাই নিঃসন্দেহে ধর্ম রাজনীতিতে একটা শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। 
তবে ধর্মের আলোকে রাজনীতি হচ্ছে, না কি রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা আলোচনার বিষয়। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে জনগণের সমর্থন আদায়ে ধর্মকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। তবে ধর্মের মূলনীতির ভিত্তিতে পৃথিবীর কয়েকটা দেশে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। কিন্তু ধর্মের মূলনীতি সমূহের কতটুকু ধরে রেখে রাজনীতি করা হচ্ছে তা আপেক্ষিক বিষয়। তবে ইসলাম ধর্ম যেহেতু পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা তাই ইসলাম ধর্মের আলোকে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে অনেক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আধুনিক রাজনীতিজ্ঞের প্রবল প্রভাব ও ধর্মীয় রাজনীতির বিপক্ষে শক্তিশালী অবস্থান থাকার কারণে ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলো কোণঠাসা হয়ে আছে।
 
৪. যদিও কিছু কিছু মুসলিম পন্ডিতের মতামত ভিন্ন। তাদের অনেকেই নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার্থে সরকারের বিরাগভাজন হতে চান না। তারা হাদিস-কোরআন থেকে গবেষণা করে কতগুলো দূর্বল হাদিসের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝাতে চাচ্ছেন, ইসলামে রাজনীতির কোনো স্থান নেই। এই নির্বোধ ও স্বার্থলপুপ পন্ডিতরা প্রকাশ্যে সূরা আনমের ৩৮নং আয়াত ও সূরা মায়িদার ৩নং আয়াতের অপব্যাখ্যা দিয়ে অথবা এড়িয়ে গিয়ে নিরবে সত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন একইভাবে তারা অস্বীকার করছে সূরা নিসা ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালার শাশ্বত বাণী: ‘হে ইমানদার মানুষরা তোমরা আল্লহর আনুগত্য করো,আনুগত্য করো (তার) রাসুলের এবং সেসব লোকদের যারা তোমাদের মাঝে দায়িত্বপ্রাপ্ত (উলুল আমর) ,অতপর কোন ব্যাপারে তোমরা যদি একে অপরের সঙ্গে মতবিরোধ করো,তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্যে) আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।’

৫. তাফসীরবিদ্দের মতে, এখানে উলুল আমল বলতে ইসলামী রাষ্ট্রের ও ইসলামী সংগঠনের মুহাদ্দিছ-আমীর, ফক্বীহ ও মুত্তাকী আলেমগণকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা আল্লাহর আনুগত্য এবং তার নবীর সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক মানুষকে সৎ পথে চলার আদেশ দেন তারাই উলুল আমলের অন্তর্ভূক্ত (তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা নিসা –৫৯ দ্রঃ)। এই আয়াতের স্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও উক্ত রাষ্ট্রের প্রধানদের অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তাফসির গ্রন্থাবলিতে ‘উলুল আমলের’ বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে তন্মধ্যে ২ টি ব্যাখ্যা বেশি প্রসিদ্ধঃ (ক) সুন্নার ইলমের অধিকারী ফাকিহ ও মুজতাহিদগণ এবং (খ) মুসলিম শাসক বর্গ। আল্লামা রাযি (রাহ) ১ম ব্যাখ্যার সমর্থনে বলেছেন, বস্তুত আয়াতে উলুল আমল ও উলামা শব্দ দুটি সমার্থক। ইমাম আবু বাকার (রাহ) বলেন, উলুল আমর শব্দটির অর্থ ব্যপক, তাই এই দুইটি ব্যাখ্যায় মূলত কোন বিরোধ নেই। সুতরাং ধর্মীয় বিষয়ে ১ম ব্যাখ্যাটা গৃহীত হবে। আর আহকাম ও মাসআলার ক্ষেত্রে ২য় ব্যাখ্যাটা গৃহীত হবে। আয়াতের অর্থ হবে, তোমরা রাজনীতি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শাসকবর্গের কথা আর আহকাম ও মাসআলার ক্ষেত্রে উলামাদের অনুসরণ কর।[আহকামুল কুরআন-২। ২৫৬; ও তাফসিরে কাবির-৩। ৩৩৪।] 

৬. যারা দাবি করেন ইসলামে রাজনীতি নেই, তারা কিভাবে সমাজে আল্লাহর এই আদেশ ও নিষেধ বাস্তবায়ন করবে? সূরা আল-ইমরানের ১০৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের (মুসলমানদের) মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত,যারা মানুষকে সৎ কাজের আহ্বান জানাবে, নির্দেশ করবে ভাল কাজের এবং এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে। এরাই হলো সফলকাম।’ এই আয়াতে বলা হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে একটা দল প্রয়োজন যারা ভালকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেদ করার ক্ষমতা রাখে। হতাশাবাদীদের কাছে প্রশ্ন এই দলের অন্তর্ভুক কারা এবং তারা কোন কর্তৃত্ব বা প্রাধিকারের বলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার অধিকার রাখে? যার একমাত্র গ্রহণযোগ্য উত্তর হলে, আলোচ্য দল বলতে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার জন্য যারা নির্বাচিত কিংবা মনোনীত তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। একজন মুসলিমের জন্য এই দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া অত্যাবশ্যক। আর যারা এই দলের শামিল না হয়, তাহলে তারা হয়তো হতে পারেন মুনাফেকদের দলের অন্তর্ভুক্ত। মুনাফেকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৬৭ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘মুনাফেক নর ও মুনাফেক নারী একে অপরের অনুরূপ। অসৎ কাজে আদেশ দেয় আর সৎ কাজ করতে নিষেধ করে।’

অন্যদিকে ঈমানদার ব্যক্তির পরিচয়ও আল্লাহ সূরা তাওবার ৭১নং আয়াতে তুলে ধরেছেন, ‘ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ করতে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে।’

এই সূরা তাওবার এই আয়াতদ্বয়ের মধ্য দিয়ে মুনাফেক আর মুমিনের পরিচয় দিয়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ‘সৎ কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ নিষেধ কর’ এই বাণী দিয়ে মুনাফেক ও মুমিনের মধ্যে পার্থকের সূচক অংকন করেছেন। সুতরাং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সমাজের প্রত্যেক মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। নচেৎ তারা মুনাফেকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

৭. ইসলামিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মানব রচিত কোন পদ্ধতি নয়। ঐশী বাণী নির্দেশিত বিধি-বিধানের উপর ভিত্তি করে ইসলামি রাজনীতি প্রচালিত হয়। ইসলামিক রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য এবং ইসলামি রাষ্ট্রের শাসকের মৌলিক দায়িত্ব কি হবে তা আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ সূরা হাজ্জের ৪১ নং আয়াতে নামায কায়েমকে কর্তৃত্ব প্রাপ্ত খলিফার প্রথম দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন:  ‘আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ) ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সব কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে।’

আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশে ইসলামি রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং ইসলামি রাষ্ট্রের আমির বা শাসকের প্রাথমিক দায়িত্ব কী হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। খেলাফে রাসেদিন তথা প্রথম শতাব্দীর ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে এই আয়াতের বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। আল্লাহর বিধান দুই ধরণের:

(ক) আল্লাহ বিধান জারি করেন এবং নিজেই বাস্তবায়ন করেন- চন্দ্র, সূর্যের উদয়, অস্ত এবং আবর্তন ইত্যাদি।
(খ) আল্লাহ বিধান জারি করেন কিন্তু বাস্তবায়নে ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা বা শাসকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন মদ্যপানের শাস্তি, ব্যভিচারের শাস্তি, চুরির শাস্তি। 

এক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালাত দ্বিতীয় বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি ‘উলুল আমর’দেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ভাবে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করার বিধানকে শরীয়ত বলা হয়। কাজেই ইসলামি রাষ্ট্র ব্যতিত এই শরীয়ত বাস্তবায়িত করা কল্পনাতিত। 

৮. ধর্ম হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সর্বোপরি পারস্পারিক আচার-আচরণের মাপকাঠি নির্ধারক ও  মানবসভ্যতা বিকাশে সর্বোত্তম পস্থা। বিধাতা সৃষ্টির সূচনাতেই একটা পরিপূর্ণ জীবন বিধান (ধর্ম) দিয়েই মানব জাতি সৃষ্টি করেছেন। এই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার অভ্যন্তরেই অন্যান্য নীতির সঙ্গে রাজনীতি নিহিত রয়েছে। কালের আবর্তে বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর কর্তৃত্ববানরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বিধাতা কর্তৃক প্রেরিত জীবন বিধানে সংযোজন বিয়োজন এনে নতুন ধর্মের অবতারণা করেছে। 

যেমন ইহুদি-খ্রিষ্টানরা আল্লাহ তায়ালার বাণীতে তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা (সূরা আলে ইমরান: ৭৮) বলেন, ‘আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাকিয়ে কিতাব পাঠ করে যাতে তোমরা মনে কর তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। 
অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয় এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নয়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যাচার করে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ৭৫ ও ৭৯ নাং আয়াত সমূহে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীরা তাদের আসমানি কিতাবের বিভিন্ন বিধানকে পরিবর্তন করার কথা বলেছেন।
 
৯. অন্যদিকে মুসলিমরা ইসলামকে বিধাতা কর্তৃক মনোনীত ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস করে কারণ কেবল ইসলাম ধর্মের মূলনীতি তথা মূল ধর্মগ্রন্থ কোরআনের কোন সংযোজন কিংবা বিয়োজন হয়নি। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবীর মধ্যে সমভাবেই এই এক ও অভিন্ন দ্বীনই বিদ্যমান ছিল। 

কেবল পবিত্র কোরআনেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কেবল ইসলামই হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম (সূরা আলে-ইমরান-১৯)। ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম বা বিধান কে মান্য করা কিংবা তাদের উপর নির্ভর করা ইসলামকে অবমাননার সামিল। আল্লাহ তায়ালা (সূরা আলে ইমরান: ৮৫) আরো বলেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন ধর্ম তালাশ করবে কখনো তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম বিধান যা সর্বকালে সব জাতির কাছে যুগোপযোগী। নতুন করে ইসলামে কোন বিধানের সংযোজনের প্রয়োজন নেই। 

পবিত্র কুরআনে সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আজ আমি তোমাদের জন্য আমার দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামতকে তোমাদের উপর পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন {ধর্ম} মনোনীত করলাম। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন যে তিনি দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন, তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কিত বিষয়াদি ব্যতিত কিভাবে আল্লাহ তায়ালা তার দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলেন? 

ইসলামে রাজনীতি: 

১০. ওয়েস্টার্ন রাজনীতির সঙ্গে ইসলামি রাজনীতির কোনো সামঞ্জস্য নেই। কারণ ইসলামি রাজনীতি হল একমাত্র আল্লাহ পাকের আরাধনা ও সন্তুষ্টি বিধানের জন্য কল্যাণময় জীবনচর্চা করা। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানি ডোনাল্ড ই. স্মীথ তার রিলিজন অ্যান্ড পলিটিকাল ডেভেলাপমেন্ট বই মুসলিম সমাজ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেন, সামাজিক, সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে ইসলামিক সমাজ ব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা যেখানে ধর্ম স্বতন্ত্রিক স্বায়ত্ত্বশাসিত কোন এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সমাজের সব প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ম প্রবিষ্ট হয়। [বোস্টন, লিটল ব্রাউন, ১৯৭০, পৃঃ ৫৯] 

১১. ইসলামে রাজনীতি হলো এমন এক ব্যবস্থাপনা যাতে ইসলামি শরীয়াহ পদ্ধতিতে নির্বাচিত নেতৃত্বের ভিত্তিতে শরীয়তের সব নীতির আলোকে রাষ্ট্র প্ররিচালনা করা হয়। মানবসভ্যতার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য এমন কিছু নেই যা ইসলামে অনুপস্থিত। পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ইসলামে নির্দেশিত। 

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা আল আনমের ৩৮ আয়াতে বলেন, আমি আমার এ গ্রন্থে (আল কোরআনে) বর্ণনা বিশ্লেষণে কোনো কিছুই বাকি রাখিনি। অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা যাতে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রভৃতি সম্পর্কে রয়েছে পরিপূর্ণ ব্যবস্থা। কোরআন-সুন্নাহ বিশ্লেষণ করে এটা পতিয়মান যে ইসলামিক রাজনীতির বিধিবিধান শ্বাশ্বত ও বিশ্বজনীন যাতে সর্বস্থরেরে জনগণের ন্যায়সঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। 

১২. রাজনীতিতে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার মধ্যমে রাজনীতির পরিপূর্ণতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজ বা রাষ্ট্রে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রাক্ষায় কিংবা সার্বিক নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। রাষ্ট্র থেকে ফেৎনা-ফ্যাসাদ নির্মূল করতে রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে ন্যায়পরায়ণ শাসকের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র অর্পণ করাও জিহাদের শামিল। (জিহাদ শব্দের সর্বাধিক ব্যবহৃত অর্থ প্রচেষ্টা করা)।

সুরা বাকারার ১৯৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমরা তাদের সঙ্গে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোনো জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা জালেম (তাদের ব্যাপার আলাদা)।  রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকে সুচারুভাবে পরিচালনা করার জন্য সরকার বা পরিচালনা পরিষদ থাকা অপরিহার্য। তাই সরকার বা পরিচালনা পরিষদ গঠনের শরীয়াহ পদ্ধতিতে পরিচালিত নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সূরা হজের ৭৫ নং আয়াতে বলেন, (হে ঈমানদারগণ!) আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত উপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে অর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে আমানত বলতে রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব প্রদান করাকে বুঝানো হয়েছে এবং রাষ্ট্র জনগণের আমানত। ইসলামিক রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনীধিদের যে সব গুণ থাকতে হবে তা হল: তাকওয়া ও ন্যায়-পরায়ণতা; রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা; ও রাজনৈতিক দূরদর্শিত আর দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা। 

১৩. একই পদ্ধতিতে রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। ইসলামিক রাষ্ট্র কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯), ‘আর আপনি কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালবাসেন।’ 

একটা হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন, আমাকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। [মিশকাত] রাসুল (সা.) যা যা করেছেন তার প্রত্যেকটা কাজই মুসলিমদের কাছে অনুকরণীয়। যেহেতু তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার পরবর্তীত খোলাফায়ে রাশেদিনরা ও রাষ্ট্র প্ররিচালনা করেছেন, তাই মুসলিমদেরও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। 

১৪. নির্বাচিত সরকার তথা পরিচালনা পরিষদকর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের পর্যালোচনা করা ও জনস্বার্থবিরোধী সরকারি নীতির বিরুদ্ধে সরকারের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রতিটি নগরিকের ঈমানী দায়িত্ব। এই ব্যাপারে রাসূল (সা.) (জামেঽ আত তিরমিযী) বলেন, সাবধান কারো যদি সত্য জানা থাকে, তাহলে মানুষের ভয়ে যেনো সত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত না থাকে।

এছাড়া মুসনাদে আহমাদের বর্ণীত এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলা।

উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাকে বাইয়াত দিলাম। তিনি তখন আমাদের থেকে যে বাইয়াত নেন তার মধ্যে ছিল, আমরা শুনবো ও মানবো, আমাদের অনুরাগে ও বিরাগে, আমাদের সংকটে ও স্বাচ্ছন্দ্যে এবং আমাদের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিলেও যোগ্য ব্যক্তির সঙ্গে আমরা নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল করবো না। তিনি বলেন, যতক্ষণ না তোমরা তার মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখতে পাবে এবং তোমাদের কাছে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকবে। [মুত্তাফাকুন আলাইহি] রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য তেমন নির্বাচিত ব্যক্তি বা দল যদি কুফরি করে কিংবা মানব রচিত রাজনৈতিক বিধিবিধান মুসলিম নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেই শাসক বা দলকে অপসরণ করা নাগরিকদের কর্তব্য।
 
উপসংহার: 

১৫. রাজনীতির সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি সম্পর্ক একটা মৌলিক নাগরিক কর্তব্য যার অনুপস্থিতিতে একটা রাষ্ট্রে আইনহীনতা, তথা জুলুম, অন্যায়, অবিচার বেড়ে যায়। আর ইসলাম যেহেতু একটা পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা তাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিও ইসলামে নির্দেশিত। রাজনীতি হচ্ছে ইসলামের নির্দেশনা এবং একে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। ইসলামী আইন বস্তুগত জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের সামঞ্জস্য বিধান করে জনগণের নৈতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আচরণ বিধি নির্ধারণ করেছে। ইসলামিক রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্রযন্ত্রে ক্ষমতা ন্যায়পরায়নদের হাতে অর্পণ করে কল্যাণকর জীবন প্রতিষ্ঠা করা। তাই রাজনীতি ছাড়া ইসলামের পরিপূর্ণতা দাবি অযৌক্তিক। ধর্ম ও রাজনীতির সবচেয়ে আদর্শিক সম্পৃক্ততা ইসলামের প্রাথমিক যুগে পরিলক্ষিত হয়েছে। 

১৬. ইসলামের প্রথম রাজনৈতিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐশী নির্দেশের ভিত্তিতে, যার বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক প্রধান ছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সা.)। তিনি একই সঙ্গে নামাজের ইমামতি, সৈন্যবাহিনী পরিচালনা, বিচারকের দায়িত্ব, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জননীতি নির্ধারণ করতেন এবং অন্যদিকে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির সঙ্গে পারস্পারিক সম্পর্ক স্থাপনে উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা পালন করতেন। তিনিই দ্বি-জাতীয় সন্ধি স্থাপন করে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্রপ্রধানের পদ দখল করে আছেন যিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংকট নিরসনে নতুন মাত্রা প্রবর্তন করেন। ঐশী নির্দেশের সঙ্গে তার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদা রাষ্ট্র পরিচালনা করে অনন্য রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে আজও সমাদৃত।

১৭. ইসলামে রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীতির সমৃদ্ধশালী দেখে বাম রাজনীতিজ্ঞসহ কিছু সুবিধা প্রত্যাশি আলেমরা ইসলামিক রাজনীতিকে ভ্রান্তিমূলকভাবে উপস্থাপন করে যাচ্ছে। ইসলাম ধর্ম নিছক আচার অনুষ্ঠান, ভাবাবেগ ও কিছু বিশ্বাসের সমষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটা হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যা জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে সমস্যার সমাধান দিয়ে বিশ্বজনীন নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

লেখক: কাজী এম এ আনোয়ার
লীগাল এক্সিকিউটিভ, শাহ জালাল সলিসিটর্স লন্ডন
সাবেক প্রভাষক, ‘ল’ ডেপার্টমেন্ট, লন্ডন রেগাল কলেজ
বারিস্টার এট ল: ইউনিভার্সিটি অব ল, ইউকে (স্টাডিং)
এল.এল.এম: ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, ইউকে
এল এল বি (সম্মান): নর্থামবারিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউকে
ডিপ ইন নিউ পাওয়ার অব ইকোনোমি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি
ডিপ ইন আর্টিকেল রাইটিং: ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি
ডিপ ইন হিউমান রাইটস ল: সিটি ইউনিভার্সিটি, ইউকে
 

Ads
Ads