গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তা নির্দেশনা মানছে না বিমান

  • ৩০-মে-২০১৯ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) ফ্লাইট অপারেশনের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে।

অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যক্তির বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিকবার আপত্তি থাকার পরও তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ভিভিআইপি ফ্লাইটে। কয়েক বছর ধরেই ভিভিআইপি ফ্লাইট ও মুভমেন্টে গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তাজনিত আপত্তির তালিকায় ছিলেন বিমানের গ্রাহক সেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আতিক সোবহানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। এরপরও আতিক সোবহানকেই ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রিদেশীয় সফরের ফ্লাইটে সফরসঙ্গী হিসেবে মনোনীত করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির কারণে তিনি যেতে পারেননি। তবে বিমানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) অনুষ্ঠান, ফ্লাইটসহ যেকোনও বিষয়ে অবস্থান, দায়িত্ব পালন, সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রাপ্তরাই ভিভিআইপিদের অনুষ্ঠান বা ফ্লাইটে অবস্থান, দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ভিভিআইপি ফ্লাইটের এসওপি (স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রসিডিউর) অনুযায়ী পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, নিরাপত্তাকর্মীদের গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে সফরসঙ্গী হয়ে থাকেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তবে কোনও কারণে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজে সে ফ্লাইটে যেতে না পারলে তার প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজে যেতে না পারলে পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ভিভিআইপি ফ্লাইট অপারেশনে একই ব্যক্তিকে একাধিক সময়ে ছাড়পত্র দেয়নি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারপরও তাকেই দায়িত্ব দেওয়া অনুচিত। তারপরও গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনা ‘উপেক্ষা’ করে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন তাকেই বারবার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, এটি তদন্ত করে দেখা উচিত।’ বিতর্ক থাকার পরও তাকে গ্রাহক সেবার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক করায় অনেকের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, বিমানের গ্রাহক সেবা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আতিক সোবহান (আইডি নম্বর পি-৩১৭২৬)। তবে তাকে গ্রাহক সেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগেও তিনি গ্রাহক সেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তা নির্দেশনায় তার নাম থাকলেও তাকেই ভারপ্রাপ্ত পরিচালক করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে ২৬-২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে নেপাল গিয়েছিলেন। ওই সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন আতিক সোবহান। তবে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে ওই সময়ে চিঠি দিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জানানো হয়, ভিভিআইপি অনুষ্ঠানস্থলে দায়িত্ব পালনে আতিক সোবহানকে নিরাপত্তা সংস্থা ছাড়পত্র দেয়নি। তাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর মিউনিখ সফরের সময়ও আতিক সোবহানসহ ছয় ব্যক্তিকে ভিভিআইপি ফ্লাইট অপারেশনের দায়িত্বে না রাখতে নির্দেশনা দেয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রীর জাকার্তা সফরের সময়ও ১২ ব্যক্তিকে ভিভিআইপি ফ্লাইট অপারেশনের দায়িত্বে না রাখতে একটি গোয়েন্দা সংস্থা নির্দেশনা দেয়। ওই তালিকায়ও আতিক সোবহানের নাম ছিল।

জানা গেছে, আতিক সোবহানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আতিক সোবহান ২০০৮ সালে বিমানের সম্ভার ও ক্রয় বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। ওই সময়ে বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারে (বিএফসিসি) ভেটকি মাছের পরিবর্তে সুরমা মাছ ক্রয়সহ বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ে অনিয়ম করেছিলেন আতিক সোবহান। পরে ওই অভিযোগ তদন্ত করলে সত্যতা পাওয়া যায়। ১৯৯৪ সালে গ্রাহক সেবা বিভাগের উপ-প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালনের সময় অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের করার অভিযোগ ওঠে আতিক সোবহানের বিরুদ্ধে। ওই সময়ে তদন্তে প্রমাণ মেলায় তাকে সতর্ক করা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে নিজে না গিয়ে গ্রাহক সেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আতিক সোবহান (আইডি নম্বর পি-৩১৭২৬) নিজের মনোনীত প্রতিনিধি করেন বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত হোসেন জামিলকে। ২৮ মে একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আতিক সোবহানকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে না পাঠাতে নির্দেশনা দেয় বিমান কর্তৃপক্ষকে। পরবর্তী সময়ে আতিক সোবহানকে বিমানবন্দর না আসতে নির্দেশ দেয় বিমান।

ধারাবাহিকভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আপত্তি থাকার পরও কেন আতিক সোবহানকে ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব দেওয়া হয়, এমন প্রশ্নের কোনও জবাব পাওয়া যায়নি বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, ‘যখনই একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট যায়, প্রতিবারই প্রত্যেকের জন্য গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নেওয়া হয়। একই ব্যক্তিকে প্রতিবারই গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু এবার তার (আতিক সোবহান) বেলায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়পত্র দিয়েছিল, আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়পত্র দেয়নি। যেহেতু ক্লিয়ারেন্স দেয়নি, তাই ওই ফ্লাইটে তিনি যাননি। বিমানে ওঠার পরে তাকে নামিয়ে নেওয়া হয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেনি।’ ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

Ads
Ads