ফের ‘চৌকিদার’ মোদি: এবার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নেতৃত্ব দিন

  • ২৪-মে-২০১৯ ০৮:৪১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

তাহলে শেষ পর্যন্ত তিস্তার পানি বাংলাদেশের দিকে গড়াচ্ছেই! মমতার দর্পচূর্ণ হলো যে! যদিও পশ্চিমবঙ্গের সিংহাসন বরাবরের মতো দখলে রেখেছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। ৪২টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় নিশ্চিত করে পশ্চিমবঙ্গে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বার যেখানে এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৪টি আসন। কিন্তু টানা দ্বিতীয় বারের মতো কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসার জন্য প্রস্তুত ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজিপি) কম যায় কীসে!

১৬ আসনে জয় লাভ করে তারাও এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে যে চোখ রাঙাচ্ছে! গতবার যেখানে এ রাজ্যে তাদের আসন ছিল মাত্র দুটো! এই ফলাফলই এবার আমাদের আশাবাদী করে তুলছে। যে মমতার জন্য তিস্তার পানি কিছুতেই বাংলাদেশের দিকে গড়ানো যাচ্ছিল না এবার অন্তত বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে মোদির ১৬ আসনের বিজয়ীরা শক্ত অবস্থান নিতে পারবেন। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও বলছেন, তারা মনে করছেন দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে সুরাহা হবে। দলটি বলছে, গত ৫ বছরে বিজেপি ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালোই ছিল। এবারও সেই যাত্রা অব্যাহত থাকবে।

সেই আশা নিয়ে মোদির নিরঙ্কুশ বিজয়কে আমাদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। যদিও মোদির এই বিজয় মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। অভাবিতও নয়। মাত্র পাঁচ বছরের মেয়াদে তিনি ভারতে যে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন তা গোটা ভারতেই অভূতপূর্ব। তার আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রীই এতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেননি। কেননা, সাংগঠনিকভাবে বিজিপিও নয়, প্রায় সম্পূর্ণ এককভাবেই মোদির জনপ্রিয়তাই টানা দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করল। ‘চৌকিদার’ মোদি আরও বিক্রম নিয়ে থাকছেন আবারো ক্ষমতায়। বিতর্কিত নানা অধ্যায় ছাপিয়ে নিজেকে ‘চায়েওয়ালা’ পরিচয় দিয়ে পাঁচ বছর আগে ভোটের লড়াইয়ে জিতে দিল্লির মসনদে বসেছিলেন মোদি; এবার ভোটের আগে শাসক পরিচয়ের পরিবর্তে নিজেকে ‘চৌকিদার’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস পরিবারের প্রতিনিধি অভিজাত রাহুল গান্ধীর পরিবর্তে ‘চৌকিদার’ মোদিতেই ভরসা খুঁজেছেন ভারতের প্রায় ৯০ কোটি ভোটার।

ভারতের জাতীয় নির্বাচনে এবারের নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে বিজেপিকে দেখা গেছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিরাট মনোপলি বিজয়লাভ করা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণার অন্ধ অনুসরণ। ভোটারদের আকর্ষণের লক্ষ্যে এবার মোদির বিজিপিও আওয়ামী লীগের মতোই জনতুষ্টিকর গান বা লিরিকের ঢেউ তুলেছে গোটা ভারতে। শেখ হাসিনার ফর্মুলাতেই ‘চৌকিদার’ মোদি গোটা ভারতের একমাত্র ভাগ্যবিধাতা হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণা চালান এবং তাতে শেখ হাসিনার মতোই সফল হন। 

সর্বশেষ ফলাফলে দেখা গেছে বিজেপি (এনডিএ) জোট পেয়েছে ৩৪০টি আসন। আর তাতে ২৭৫টি আসনেই বিজেপি এককভাবে এগিয়ে আছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেখানে বিজেপি জোট ২৮২টি আসন পেয়েছিল এবং লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৩৩৬টি আসন পেয়েছিল। আর ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস (ইউপিএ) জোট এবারের নির্বাচনে পেয়েছে ৯২টি আসন। গতবারের নির্বাচনে যেখানে তারা পেয়েছিল ৪৮টি আসন। লক্ষণীয় যে, দুটো প্রধান দলই গতবারের চেয়ে উন্নতি করেছে। কিন্তু কংগ্রেসের উন্নতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উন্নতি নয়, আসনের উন্নতি। 

তবে বিজেপিও এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বড় বিজয় যেমন মানুষকে বড় মনের করে তোলে, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে নৃশংসও করে তোলে। এক্ষেত্রে আমরা জার্মানির এডলফ হিটলারের কথা স্মরণ করতে পারি। আমরা তাই বিজেপির এই বড় বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রথমটিই প্রত্যাশা করি। তাইতো এই বিজয়ে আত্মহারা না হয়ে মোদি নিজেও বলেছেন, ‘তাদের আমি আশ্বস্ত করি, সবার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা কাজ করব।’ শুধু অভ্যন্তরীণ ভারতেই নয়, আমরা আরও প্রত্যাশা করবো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি সামনে থেকে কাজ করে যাবেন। অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে সব ধরনের স্নায়ু উত্তেজনা, পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক বৈষম্য দূরীকরণে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, অত্র অঞ্চলটিতে আজকে কয়েকটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভক্ত হলেও ঐতিহ্যগতভাবে আমরা একই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যেও অংশ ছিলাম। তাতে যেন রাষ্ট্রের নেতিবাচক অভিঘাত লেগে কোনো প্রকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমরা আমাদের স্বার্থেই একটি সমৃদ্ধশালী ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন দেখি। আশা করি, মোদির নেতৃতে ভারত সেই উচ্চতায় উন্নীত হবে।

Ads
Ads