ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি: এই মরণযাত্রার জন্য দায়ী কোন সভ্যতা?

  • ১৩-মে-২০১৯ ১০:৩০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি কিংবা একটু উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর মানুষ যখন কোনো উপায়ন্তর না পায় তখনই দেশান্তরি হয়। মানবসৃষ্ট বৈধ পথে সুযোগের সব রাস্তা রুদ্ধ হলে তখন অবৈধ পথেই পা বাড়ায়। আর নিরুপায় মানুষের সেই স্বপ্নের পথে প্রতারণার জাল বিছিয়ে রাখে দুর্বৃত্ত শ্রেণির কিছু অমানুষ। গত রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর হয়, অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জনই বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। বাদবাকি মিসর, মরক্কো, শাদসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নাগরিক ছিলেন। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য তিউনিসিয়ার জেলে ও কোস্ট গার্ডরা ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যাদের মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশি। জীবিতরা জানিয়েছেন, ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে একটি বড় নৌকায় চড়ে লিবিয়ার উপকূল থেকে রওনা হওয়ার পর ওই নৌকা থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট রাবারের তৈরি ‘ইনফ্লেটেবেল’ একটি নৌকায় তাদের তোলা হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি ডুবে যায়। এ থেকে ধারণা করা যায়, আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের বেশ ভালো নেটওয়ার্ক রয়েছে বাংলাদেশে।

এর আগেও একই ধরনের বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমনকি মরুভূমিতে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করার কিংবা অনাহারে অনেকের  মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে; জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম চার মাসে লিবিয়া থেকে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার সময় নৌকা ডুবে অন্তত ১৬৪ জন মারা গেছেন। অতীতে বৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে অনেকে অবৈধ পন্থায় দেশটিতে যাওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে এবং পরে থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গণকবর আবিষ্কৃত হলে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ শুরু হয়। ওইসময় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের উদ্ধার করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দাতব্য সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, থাইল্যান্ড থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত অনেকগুলো মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। দেশে দেশে তারা নেটওয়ার্ক বিস্তার করে মানবপাচারের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে। শুধু পাচার নয়, নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ও এদের অবৈধ উপার্জনের একটি বড় কৌশল। মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির মতো অমানবিক অভিযোগও রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। তার ওপর নৌকায় করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তারপরও মানুষ কেন ওদের খপ্পরে পড়ে? তার কারণ, এদের নিয়োজিত এজেন্ট বা দালালরা দিনের পর দিন মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে মানুষকে বোকা বানায়। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয়, দেশে বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে। যদিও বিবিএস-এর তথ্যে এটা অস্বীকার করা হয় বা কমিয়ে বলা হয়। যতোই যা কিছু করা হোক না কেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না, এটা মনে রাখা উচিত। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রায় সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই নানা উপায়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে তারা প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে মানুষ সর্বস্বান্তই হচ্ছে না, মৃত্যুমুখেও পতিত হচ্ছে; ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর ঘটনা তারই প্রমাণ। প্রতারণার কারণে বহির্বিশ্বের সম্ভবনাময় শ্রমবাজার এদেশীয় শ্রমিকদের জন্য নিষিদ্ধ জোনে পরিণত হওয়ার কথা সর্বজনবিদিত। বৈদেশিক শ্রমবাজার যাতে হাতছাড়া না হয়, এ ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যাপারেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।  কোনো নৌকা যাতে ইতালির উপকূলে ভিড়তে না পারে সে জন্য কোস্ট গার্ড নিয়োজিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন কেউ ইউরোপে প্রবেশ করলেও তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এসব বিষয়ে তরুণদের সচেতন করতে হবে, যাতে তারা পাচারকারীদের খপ্পরে না পড়ে।

ভূমধ্যসাগরের দুর্ঘটনা থেকে যারা বেঁচে গেছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে সেসব দালালকে চিহ্নিত করতে হবে, যারা মিথ্যা প্রলোভনের মাধ্যমে তাদের নিয়ে গিয়েছিল। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অপরাধীচক্রকে নির্মূল করা না গেলে ভবিষ্যতে এরা বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করবে এবং তখন তাদের দমন করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়বে। কাজেই আমাদের প্রত্যাশা মানব পাচারকারীদের ডালপালা আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আগেই তাদের ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 

Ads
Ads