সীমানা পেরিয়ে

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ভয়ের নেপথ্য

রোহিঙ্গা

:: কালাম আজাদ ::

রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন নিন্দার ঝড় বইছে, তখন মিয়ানমারের সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তা-ধারা ঠিক বিপরীত। তাঁদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি অনাকাক্সিক্ষত ও অগ্রহণযোগ্য। মিয়ানমারে যেকোনো মানুষের সঙ্গে কথা বললে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি তাঁরা উচ্চারণই করবে না। অধিকাংশ মানুষ মনে করে রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তাঁরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সে দেশের নাগরিক মনে করে না। মনে করা হয়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। তাঁদের ভাষা এবং সংস্কৃতি ভিন্ন।

বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা সংকটকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হলেও মিয়ানমারের ভেতরে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে। রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন আছে মিয়ানমারের ভেতরে। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমও সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী কথা বলছে। মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষ মনে করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একপেশে সংবাদ পরিবেশন করছে।

সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে অন্যরা সহিংসতা থেকে বাঁচতে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেভাবে পালিয়ে এসেছে সেটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসছে না। বিষয়টিকে এভাবেই দেখছে সেখানকার অধিকাংশ মানুষ। রাখাইনের সংঘাত কবলিত এলাকাগুলোতে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমে প্রধান পাচ্ছে রাখাইনে ‘সন্ত্রাসী হামলার’ বিষয়টি। সেজন্য ‘বাঙালি সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসীরা গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা যে বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে সে সংক্রান্ত কোনও খবর নেই মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমে।

মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছে যে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব মিয়ানমারে নতুন কিছু নয়। তাঁদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের বিবেচনা করা হয় না। রোহিঙ্গারা যে ভাষায় কথা বলে সেটি রাখাইন অঞ্চলে অন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষার চেয়ে আলাদা।

মিয়ানমারের জাতীয়তাবাদীরা রোহিঙ্গাদের হুমকি মনে করে। তাঁরা যে বিষয়টি প্রচারণা চালিয়েছে সেটি হচ্ছে- মুসলমান পুরুষরা চারজন স্ত্রী রাখতে পারে। ফলে তাদের অনেক সন্তান থাকে। অনেক রাখাইন মনে করে, যেভাবে মুসলমানদের জনসংখ্যা বাড়ছে, এর ফলে তাঁরা একসময় রাখাইন অঞ্চল দখল করে নেবে। মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ ধারণা পাওয়া যায়।

এক নারী বলছিলেন, তাঁদের কোনও লেখাপড়া নেই। তাঁরা কোনও চাকরি পায়না । তাঁদের অনেক সন্তান। আরেকজন নারী প্রশ্ন তোলেন, আপনার প্রতিবেশীর যদি অনেক বাচ্চা থাকে এবং তাঁরা যদি পাশের বাড়িতে গিয়ে শোরগোল করে, আপনি কি তাদের পছন্দ করবেন? প্রশ্ন করেন আরেকজন নারী।

তিনি বলছিলেন, এক হাতে তালি বাজে না। ঘটনার অন্যদিকও আছে। তবে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু মানুষ আছে। কিন্তু তাঁরা ততটা সরব নয়। একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার বলেন, আমার মনে হয় বহু বাঙালি মুসলমান মারা গেছে। আমার হয়, সরকারি সৈন্যরা তাঁদের অনেককে হত্যা করেছে। আমার মনে হয়, জাতিসংঘের এখানে জড়িত হওয়া উচিত।

 

ভোরের পাতা/ই

আপনার মন্তব্য লিখুন

সীমানা পেরিয়ে | আরো খবর