অর্থনীতি

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ২০%

:: ভোরের পাতা অনলাইন ::

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে সারাবিশ্ব থেকে টাকা জমা রাখার পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশ থেকে টাকা রাখার পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৬ সালে এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে টাকা জমা রাখা হয়েছে ৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার পাঁচশ ৬৬ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের তুলনায় এর পরিমাণ ২০ শতাংশ বেশি। বৃহস্পতিবার (২৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জুন) সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সুইজারল্যান্ডের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালে এ আমানতের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি, ২০১৩ সালে তিন হাজার ১৪৯ কোটি এবং ২০১২ সালে ১ হাজার ৯৯১ কোটি, ২০১১ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে জমানো টাকার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছরই জমানো টাকার পরিমাণ বেড়ে চলছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের আস্থা ক্রমেই কমে আসছে। ফলে গত কয়েক বছর ধরে সুইস ব্যাংকে বিদেশিদের আমানতের পরিমাণ কমছে। এই অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশি নাগরিকদের আমানতের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।

এসএনবির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থ জমার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সাল থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে অর্থ জমার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ কোটি ৮০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।

২০১২ থেকে ২০১৬ সাল—এই সময়ের মধ্যে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের জমা রাখা অর্থের পরিমাণও তিন গুণ বেড়ে গেছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমার পরিমাণ ২০১৬ সালে এসে আগের বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে ভারতের জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২১ কোটি সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে এসে ভারতের জমার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ৪০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।

আবার ২০০৯ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৯০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, আর এখন তা ৩৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।

সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত দুই দশক ধরে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। মাঝে-মধ্যে দুই এক বছর তা কমলেও গড়ে বেড়েছে। গত ২০১৬ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলঅদেশি নাগরিকদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা বা ৬৬ কোটি ২৫ সুইস।

সুইজারল্যান্ডের মুদ্রার নাম সুইস ফ্রাঁ। বর্তমানে প্রতি সুইস ফ্রাঁ সমান বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৪ টাকা। আবার এক সুইস ফ্রাঁ সমান ১.০৪ ডলার। গত বছর প্রতি সুইস ফ্রাঁ সমান ছিল ৮৮ টাকা। ফলে ওই এক বছরে তাদের মুদ্রার মান কমেছে। এ কারণে টাকার হিসাবে পাচার করা অর্থের পরিমাণও কম বেশি হয়।

গত ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা (বর্তমান মুদ্রা বিনিময় হারে ৪ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা), ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৪৫২ কোটি, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ২৭৩ কোটি, ২০১২ সালে ২ হাজার ১৪ টাকা, ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৪০ কোটি, ২০১০ সালে ২ হাজার ৭৩ কোটি, ২০০৯ সালে ১ হাজার ৩১৯ কোটি, ২০০৭ সালে ২ হাজার ১৩৯ কোটি, ২০০৫ সালে ৮৫৬ কোটি, ২০০২ সালে ২৭৫ কোটি, ১৯৯৯ সালে ৩৮৭ কোটি এবং ১৯৯৬ সালে ৩৩৭ কোটি ছিল সুইস ব্যাংকে।

সুইস ব্যাংকে টাকা পাচারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত এবং পাকিস্তানের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। তবে কোনো বাংলাদেশি তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করলে তার তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। একইসঙ্গে অন্যান্য সম্পদ ও চিত্রকলা জমা রাখলে তার হিসাবও এতে নেই। তবে সামগ্রিকভাবে ২০১৬ সালে মোট আমানতের পরিমাণ কমেছে। আমানতের রাখার ক্ষেত্রে এ বছরও প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য।

ধারণা করা হয়, সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রাখার পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে বেছে নেন আমানতকারীরা। কারণ গ্রাহকদের তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসব ব্যাংক অর্থ গোপন করার জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা সাংবাদিকদের জানান, সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনটি কিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক অবগত নয়। তবে মানি লন্ডারিং রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের টাকা জমা রাখার প্রসঙ্গে বলেন, ‘এসব ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের ধরণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই।’ তবে অনেকেই এসব ব্যাংকে তাদের মূল্যবান সম্পদ জমা রাখেন এবং টাকা সাধারণত বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

 

অনলাইন/এইচটি 

আপনার মন্তব্য লিখুন

অর্থনীতি | আরো খবর