এডিটর
শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭ ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

শুনিতে কি পাও এ শিশুর কান্নার ধ্বনি

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?তারি রথ নিত্যই উধাওজাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন-চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।’- শেষের কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই ‘বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন’ ধ্বনিই আজ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দিগ্বিদিক হয়ে গুমরে গুমরে মরছে নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং ঝাড়েবংশে নিঃশেষিত রোহিঙ্গাদের। সারা পৃথিবীর দৃষ্টি এখন মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের দিকে। বিশ্ব যখন উন্নত প্রযুক্ত আইটিতে অতীতের সব অর্জনগুলোকে ছাপিয়ে উঠেছে, ব্যবসায়, প্রশাসনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে তখন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে চলছে সেই অতীতের মধ্যযুগীয় কায়দাকেও হার মানা এক জাতি নিধনযজ্ঞ।

এমন নারকীয় নিধনযজ্ঞ, যা সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। একদিন লাইন ধরে শত শত নারী ও শিশুকে গণধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা, পুরো দেহ কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে চিরকালের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ভাইয়ের সামনে, পিতার সামনে, স্বামীর সামনে নারী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড যত নারকীয় কা- আছে তার কোনোটাই বাদ যাচ্ছে না মধ্যযুগীয় বর্বর সু চি ও তার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার যাবতীয় পরিকল্পনা। নিশ্চয় তাদের এই নিধনযজ্ঞের কবলে পড়ে হাজার হাজার নারী ও শিশু, যুবক, প্রৌঢ় থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত যে গগণবিদারী কান্না আকাশ বাতাস ভারি হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে আছড়ে পড়ছে তার কান্না কি সমগ্র বিশ্ববাসী শুনতে পায়? নাকি এই বিশ্বের বড় একটা অংশই অন্ধ ও বধির হয়েই আছে নিজ নিজ স্বার্থের টানে? যারা অন্ধ ও বধির হয়ে আছে, তাদের কি জীবনেও কখনো কোনো কারণে কান্না পায় নি? তাদের চোখ কি কখনো ভেঁজে না? তাদের চোখ কি চিরকালের জন্যই শকনো? তাহলে তো সে চোখ পাথরের, প্রাণজীবনের নয়। এমন পাথরের চোখের মানুষ তবে ‘রাষ্ট্র’ চালায় কীভাবে? রাষ্ট্র তো ইঁটপাথরের তৈরি কোনো বস্তু নয়।

রাষ্ট্র তো হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনা-সুখ-দু:খের সমষ্টিসমগ্র মানুষ নিয়েই গঠিত। যে, বর্বর মিয়ানমারের সু চির চোখে জল থাকবে না, দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধানের চোখে জল থাকবে না, জল থাকবে শুধু মাঠে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষেরই?আজ সমগ্র শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে জেগে উঠতে হবে। জেগে উঠতে হবে সেইসব রাষ্ট্রগুলোকে যারা এইসব মানুষকে নিয়ে ‘রাষ্ট্র’ নামক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে। প্রতিরোধ করতে হবে এই অশুভ শক্তি অসূরের বিরুদ্ধে। আর এই জেগে উঠার জন্য যিনি সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ মিয়ানমার নামক দানব অসূর রাষ্ট্রটি যে মারণাস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে তা তারা কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চায়? কাদের টার্গেট করে প্রায় পাঁচ হাজার মিসাইল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে? যে মিসাইলের গতি একেকটি ৭০০-৮০০ মাইল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, দেশটি বারবার যুদ্ধে উসকানি দিয়েছিল বাংলাদেশের দিকে। তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বাংলাদেশকে যেন তাদের সেই উস্কানির জবাব দেয়। তারপরই তারা হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিল বাংলাদেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। তারা কি তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠাচ্ছে আমাদের সংঘে যুদ্ধ করার জন্য।

ইতিপূর্বে অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতও বলেছিলেন, মিয়ানমার আমাদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে। তার সেই উক্তির বেশ কিছু পরেই দেশটির ড্রোন, হেলিকপ্টার বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে। এর সবকিছুরই জবাব দেয়ার জন্য আজ প্রয়োজন বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। যেমন ’৭১ এ ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন। সেই দায়িত্বটি এখন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের বুকফাটা কান্নার ধ্বনি সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারে। যদি তারা আক্ষরিক অর্থেই রক্তেমাংসে গড়া হয়, তাহলে তাদের চোখেও সময়ে সময়ে জল গড়ায় মানতে হবে। তা-ই যদি হয় তাহলে সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে এই নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিঃশেষিত রোহিঙ্গাদের কান্নার ধ্বনি যদি তাদের কানে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে আমি শতভাগ নিশ্চিত এই দানব মিয়ানমারচক্রের পতন অনিবার্য। আর সেই পতনের মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হয়ে উঠবেন আমাদের অবিসংবাদিত বিশ্বনেত্রী। নিশ্চিত পতন হবে আর একটি নক্ষত্রের। সেটি অং সান সূ চি ও তার অসুর সেনাবাহিনীর।