শত বছরের পুরনো ভাসমান কাঠের হাট

শনিবার , ০৭ জানুয়ারী ২০১৭, ৯:৪০ অপরাহ্ন

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে সন্ধ্যা নদীর তীরে ভাসমান কাঠের হাটে এখনও কেনাবেচা হয়

:: মো. গোলাম মোস্তফা, স্বরূপকাঠি ::

শত বছর ধরে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠ ব্যণিজ্য এলাকা হিসেবে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠির নাম অত্যন্ত সুপরিচিত।

ধারণা করা হয়, ১৯১৭ সালের প্রথমদিকে পিরোজপুর এলাকার তৎকালীন বাখারগঞ্জের আওতাধীন বর্তমান স্বরূপকাঠি উপজেলায় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছকে কেন্দ্র করে কাঠ ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৮ সালের শেষদিকে স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেঁষে কালিবাড়ির শাখা খালে গাছ বেচাকেনার উদ্দেশে ভাসমান কাঠের হাট গড়ে ওঠে। এসময় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ, পাহাড়ি সেগুন, পশোর ও শিশুমণি গাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ ভাওয়ালিরা এ চরের হাটে নিয়ে আসতো। সে থেকেই দেশব্যাপী স্বরূপকাঠির এ চরের হাট থেকে ফার্নিচারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য হরেকরকমের গাছ সরবরাহ করা হতো।

এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৭ সালের দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের পারমিট বন্ধ করে দেওয়ায় কাঠের ব্যবসায় ধস নামতে শুরু হয়, যা এখনো কাঠ ব্যসায়ীরা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। পারমিট বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কাঠ ব্যবসায়ী তাদের পুঁজি গুছিয়ে নিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এক জরিপে জানা গেছে, এর ফলে তৎকালীন সময় স্বরূপকাঠির এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১২ হাজার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। স্ব

রূপকাঠির কাঠ ব্যবসায়ীরা জানান, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এ ৭ মাস ভাসমান কাঠের হাটে বেচাকেনা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলেও এ সময়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নানান ধরনের গাছ কম দামে কিনে আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, ও আশ্বিন মাসে বেশি দামে বিক্রির আশায় মজুদ করে রাখেন। মজুদ করা গাছগুলো নদীর চরে বা খালের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়। এ ধরনের কাঠের হাটকে ভাসমান কাঠের হাট বলা হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা কাঠের মোকামগুলোতে স্বরূপকাঠির ভাসমান কাঠের হাট বা চরের হাট থেকেই বাণিজ্যিকভাবে নানান ধরনের কাঠ সরবরাহ করা হতো, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। দুই যুগ আগেও এ হাটে সপ্তাহে দু’বার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার কাঠ ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকার কাঠ বেচাকেনা করতেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য রাজস্ব বাড়াতো।

কিন্তু বর্তমানে চর, নদীর পাড়ে ভাসমান কাঠের হাট, সুন্দরবন, ব্যবসায়ী, বন, নদী, স্থান ও গাছ টানার যানবাহন সব কিছু ঠিক থাকলেও শুধুমাত্র সুন্দরবনের মরা-পচা সুন্দরী গাছ কাটার পারমিট না থাকায় গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন জাতের গাছে মোকামগুলো কোনো রকমে টিকে আছে আদিকালের স্বরূপকাঠির এ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা। স্বরূপকাঠির স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীরা জানান, পারমিট বন্ধ থাকায় দেশব্যাপী প্রায় ৩ লাখ কাঠ ব্যবসায়ীকে ব্যবসায় মন্দার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে প্রায় অর্ধলাধিক শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন।

স্বরূপকাঠির কাঠ ব্যবসায়ীরা আরো জানান, এ পারমিটে জীবিত ও ভালো গাছ কাটা হয় না এবং জীবিত গাছের কোনো ক্ষতিও হয় না- এ বিষয়টি সরকার চিন্তা করে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের পারমিট দেওয়া শুরু করলে এ ব্যবসায় লাভের মুখ দেখা ও ব্যবসায় মন্দা আর বেকারত্ব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সরকার ও বন বিভাগের রাজস্ব বাড়বে। এ কারণে স্বরূপকাঠির কাঠ ব্যবসায়ীরা সুন্দরবনের গাছের পারর্মিট দেয়ার অনুরোধ জানান। প্রতিকুলতা সত্বেও এ উপজেলায় ছোট-বড় ২৪টি চরে কাঠের হাট রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- স্বরূপকাঠি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাঠের চরের হাঠ, মুক্তিযোদ্ধা কাঠের চরের হাট, বরছাকাঠি কাঠের চরর হাট, ডুবিরবাজার কাঠের চরের হাট, ভাইজোড়া কাঠের চরের হাট, হাজিরপুল কাঠের চরের হাট, কালীবাড়ি খালে কাঠের চরের হাট, রাজাবাড়ি কাঠের চরের হাট।

এসব চর মালিকরা খালের চর ভাড়া দিয়ে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। আবার এ উপজেলায় এমন কোনো গ্রাম পাওয়া যাবে না, যে গ্রামের মানুষ কাঠ ব্যবসার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত নেই। স্বরূপকাঠির চর হাটের কাঠের আড়তদার হাসেম আলী ও মোল্লা হাতেম আলী জানান, তাদের দুজনের ৪ ও ৩ ছেলে সবাই এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

হাসেম আলী বলেন, প্রায় ৫৫ বছর আগে ১২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করে ১০ বছর আগে তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালিক হলেও এখন তা ধরে রাখতে পারছেন না। স্বরূপকাঠিতে কাঠ নিতে আসা চাঁদপুরের কাঠ ব্যবসায়ী রুস্তম ব্যাপারী জানান, বিভিন্ন কারণে এ ব্যবসায় আগের চেয়ে লাভের অংশ কমে গেছে। এর কারণ নদীমাতৃক এলাকায় ট্রলারযোগে যাতায়াত খরচসহ দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের আগের চেয়ে বেতনভাতা বেড়েছে অনেক বেশি। এছাড়াও সুন্দবনের সুন্দরী গাছ নিলামে বিক্রি বন্ধ থাকায় দেশীয় গাছে তেমন একটা লাভ হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীইরা বলেন, অন্যান্য ব্যবসার চেয়ে এ কাঠ ব্যবসায় ঝুঁকি কম এবং তুলনামূলকভাবে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই এ ব্যবসা এখনো ধরে রেখেছেন। আর শতকরা ২০ ভাগ ব্যবসায়ী এ ব্যবসা ছেড়ে অন্যান্য পেশায় চলে গেছেন আরো প্রায় ২৫ বছর আগে। স্বরূপকাঠির বরছাকাঠি কাঠের চরের মোকামের মালিক কাঠ ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী বলেন, ১৯৬২ সালে ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করে বর্তমানে ৩টি কাঠের মোকামসহ ৪টি মিনি কার্গোর মালিক তিনি।

জানা গেছে, ১৯৯০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ চরের কাঠের হাট ও নদী বা নদীর শাখা খালে ভাসমান কাঠের হাট হিসাবে পরিচিতি হয়ে ওঠে স্বরূপকাঠি। এর পর থেকে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান এ কাঠের হাট সর্ম্পকিত প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট মিড়িয়াসহ টিভি চ্যানেলের পর্দায় তুলে ধরা হয়। সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতি- এ দু’দিন এই ভাসমান হাঠে গাছ বেছাকেনার হাট বসে। এসময় খালের বা চরের ভাসমান নৌকাগুলোর ওপর হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলা দেখে মনে হয়, এ যেন কোনোবড় রাজনৈতিক দলের মহাসমাবেশ।

এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও বরিশাল, খুলনা, চাঁদপুর, বাগেরহাট, মুলাদী, মুন্সীগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও হবিগঞ্জসহ দেশের ৬৪টি জেলার প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখনো স্বরূপকাঠির এই ভাসমান কাঠের হাটে ব্যবসায় জড়িত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঠের মোকাম গড়ে তুলছেন। নদী পথে দূর থেকে আসা কাঠ ব্যবসায়ীরা জলদস্যুদের ভয়ে ২৫-৩০টি নৌকার বহরে একই সঙ্গে স্বরুপকাঠির মোকামে আসে। কাঠ বেচাকেনার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা একই সঙ্গে চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া আবার গল্প-গুজব করেন।

যে যার মতো বেচাকেনা শেষে, আবার সারিবদ্ধ নৌকাগুলো নদী পথে চলে যায়। স্বরূপকাঠি কাঠ ব্যসায়ী লালু মিয়া বলেন,একটি গাছ চুড়ান্তভাবে ব্যবহারের আগে ৫-৬ বার বেচাকেনা হয়। দাঁড়ানো গাছ কাটা থেকে ব্যবহারের পর্যায় পর্যন্ত ৮ ধরনের শ্রমিক রয়েছে।

এছাড়াও বেচাকেনার ক্ষেত্রে গাছকাটাসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দালাল, শ্রমিক, পাইকারি আড়তদারসহ পাইকার নামে ৮ ধরনের ক্রেতা রয়েছে। একটি গাছ থেকে গাছের শিকড়, লারকী, গাছের ছাল, গাছের বাহল, গাছের গুড়ি,পলকাঠ ও সারী কাঠ এ ৭ ধরনে ব্যবহার যোগ্য পণ্য পাওয়া যায়, এর মধ্যে গাছের লাকরি, বাহল, ছাল ও গুঁড়ি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গাছের শিকড়, গাছের ভিতরের সারি কাঠ ঘর-বাড়ি, দালানকোঠা, লঞ্চের বডি ও বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করা হয়।

অন্যদিকে পলকাঠ দিয়ে অল্পসময়ে স্থায়ী বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের আসবাবপত্র ও ক্রীড়াসমাগ্রী তৈরি করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন থেকে গাছ আনার জন্য কোনোকালেই সড়কপথ ছিল না যা, এখনো নেই। এ কারণেই নৌপথে গাছ আনার জন্য কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ধরনের ব্যবসায়ী কাঠের তৈরি কাঠামি নৌকা বানিয়ে কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে সুন্দরবন থেকে গাছ আনার জন্য মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দিতেন। ৪-৫টি কাঠামি নৌকা থাকলে ৭-৮ সদস্যের যে কোনো ধরনের একটি পরিবারের বছরের ১২ মাস বেশ ভালভাবেই চলে যেত।

সুন্দরবন নিলাম বন্ধ হওয়ায় এসব কাঠামি নৌকার মালিক উপার্জন হারিয়েছেন, বেকার হয়ে পড়ছেন বিভিন্ন এলাকার হাজারো নৌকা শ্রমিক ব্যবসায়ীরা। তাই নৌকা ব্যবসায়ীরা কেউ-কেউ অন্য পেশা চলে গেছেন।
 

অনলাইন/কে

WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.
WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.