বিনয় আর নম্রতা মুমিনের দুটি বড় গুণ

শুক্রবার , ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ২:৩৭ অপরাহ্ন

:: ভোরের পাতা অনলাইন ::

মানুষের জীবনে যত উত্তম গুণাবলী রয়েছে তার মধ্যে উত্তম গুণ হলো- বিনয় ও নম্রতা। বিনয় ও নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ। যার মূর্ত প্রতীক হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত রাসূলে কারীম (সা.) ও তার সাহাবিরা। বিনয় ও নম্রতা দ্বারাই তারা মানুষকে আপন করে নিয়েছেন। বিনয়ী ব্যক্তিকে আল্লাহ যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও তাকে ভালোবাসেন। যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- ‘যারা তোমার অনুসরণ করে সেসব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও। (সূরা আশ্-শু’আরা : ২১৫)

বিনয় আর নম্রতা মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানিয়ে দেয়। বিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ পথ অবলম্বন করা ছাড়া মানুষ তার অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছতে সক্ষম হয়না। বিনয় জীবনের এমন এক অনুষঙ্গ যে, যদি কেউ তা অবলম্বন না করে তাহলে তার জীবনমরুতে অহংকার বালু তপ্ত হয়ে উঠে। সুতরাং যে কোন মূল্যে হোক জীবনের খালী মাঠে বিনয়ের সবুজ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে।

অন্যথায় অহংকারের বিষে মানুষ ফিরআউন হয়ে যায়, প্রতারিত হয়, জীবনের বহু সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। কেননা দিনের বিপরীতে যেমন রাত তদ্রুপ বিনয়ের বিপরীতে হল অহংকার। সুতরাং যখন জীবনে বিনয়ের আলো না আসবে তখন অহংকারের অন্ধকার জীবনে ছেয়ে যাবে। অন্তরে নিজের বড়ত্ব সৃষ্টি হবে। অন্তরে বড়ত্ব সৃষ্টি হওয়া এমন এক মরনব্যাধি যা অভ্যন্তরীণ সমস্ত রোগের মূল।

এই দুনিয়াতে সর্বপ্রথম যে নাফরমানী প্রকাশ পেয়েছে তার মূলে ছিল অহংকার। আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করে আদমের সম্মানার্থে ইবলিসকে সিজদা করার আদেশ করেন তখন সে অহংকারের বশবর্তী হয়ে বলে উঠল, আমি তো তার চেয়ে উত্তম, আমি কেন তাকে সিজদা করবো..?

বিনয় অবলম্বন করলে বাহ্যিকভাবে যদিও নিজেকে ছোট মনে হয়, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা উচু করে দেন। হাদীস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়াবলম্বন করবে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা উঁচু করে দিবেন। আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সহজ পথ হল বিনয় অবলম্বন করা।

শায়খ সাদী রহ. বলেন, আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার মাঝে আসমান যমীনের ব্যবধান নেই, ব্যবধান হলো অহংকারের প্রাচীর। যখন এ ব্যবধান মাঝ থেকে সরে যাবে তখন বান্দা আপনাআপনি আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। যে ব্যক্তি অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করবে সে কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে বিনয় হল ঘর থেকে বের হওয়ার পর যাকেই দেখবে তাকেই নিজের তুলনায় উত্তম বলে জানবে।

মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ মহান অহির মাধ্যমে আমার কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, নম্রতা ও হেয়তা অবলম্বন কর অর্থাৎ বিনয়ী হও। কেউ যেন অন্যের ওপর গর্ব ও অহংকারের পথ অবলম্বন না করে এবং কেউ যেন কারো ওপর অত্যাচার না করে। (মুসলিম) আমাদের নবিজির ৬৩ বছরের সুদীর্ঘ জীবনের গোটাটাই নম্রতা আর বিনয়ী আচরণে পরিপূর্ণ।

কেবল ইসলামপ্রিয় মানুষদের সঙ্গেই নয়, তৎকালীন কাফির-মুশরিকরাও নবিজির ব্যাপারে বিনয়ী না হওয়া বা নম্র স্বভাবের অধিকারী না হওয়ার কোনো অভিযোগ করতে পারেনি। বিনয়ী, নম্র এবং কোমল আচরণের অধিকারী মানুষকে সবাই পছন্দ করে।

কেবল ইসলাম ধর্মেই নয়, সব ধর্মে এবং সামাজিক বিবেচনায়ও বিনয়ী মানুষের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নম্রতা মানুষকে সামাজিকভাবে সম্মানিত করে। পবিত্র কোরানে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেছেন- অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান : ১৭)

বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই হযরত রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ স্বয়ং নম্র, তাই তিনি নম্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি কঠোরতার জন্য যা দান করেন না; তা নম্রতার জন্য দান করেন। নম্রতা ছাড়া অন্য কিছুতেই তা দান করেন না। (মুসলিম)।

অন্য হাদিসে আরও বলা, হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দানের সম্পদ কমে না। ক্ষমার দ্বারা আল্লাহ তার বান্দার ইজ্জত ও সম্মান বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করেন না। আর সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় নম্রতা নীতি অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (মুসলিম)।
মুসনাদে আহমদের এক হাদিসে হযরত রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন বলেছেন, আল্লাহপাকের জন্য যে যত বেশি নিচু হবে (এই বলে রাসুল নিজের হাতকে মাটির দিকে নামিয়ে দেখালেন), নিজেকে বিনয়ী করে রাখবে, আল্লাহপাক তাকে তত বেশি উঁচু করবেন (রাসুল তার হাতের তালু উপরের দিকে উঠিয়ে দেখালেন)। অর্থাৎ মানুষের কছে সম্মানিত করবেন।

মুসলিম শরিফের আরেকটি হাদিসে রাসুল [সা.] বলেছেন, দান-সদকায় কখনও সম্পদ কমে না, ক্ষমা ও করুণায় আল্লাহপাক ওই লোকটির সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং যে আল্লাহর জন্য বিনয় দেখাল, তাকে তিনি অনেক উঁচুতে অবস্থান করে দেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. বলতেন আল্লাহর শোকর তিনি তার পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম বিনয় অক্ষমতা প্রকাশ করা ব্যাতীত অন্য কিছু বানাননি। আর এ অক্ষমতা প্রকাশ করা বান্দার জন্য সহজ। কারণ তার আপাদমস্তক তো অক্ষমতায় ভরপুর। সুতরাং তার পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম যদি অন্য কিছু বানাতেন তাহলে বান্দা কষ্টে পড়ে যেত।

বিনয়ের সিফাত নিজের মাঝে আনতে হলে সীরাতের কিতাব অধ্যয়ন করতে হবে ও বড়দের সোহবতে থেকে তা অর্জন করতে হবে। বিনয়ের সিফাত যার অর্জন হয়ে যাবে দুনিয়া ও আখিরাতের ঘাটিগুলো সে অতিসহজে অতিক্রম করতে পারবে। আর বিনয়ের দ্বারা যে কাজ হয় যোগ্যতা ও ক্ষমতা বলে তা অর্জন করা সম্ভব হয়না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিনয়ী এবং নম্র স্বভাবের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন।

 

অনলাইন/এইচটি 

WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.
WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.