রাজনীতি
শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭ ৩ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

চার বিষয়ে বিএনপির গুরুত্ব

:: রেজাউল করিম ভূঁইয়া ::

এক-এগারোর সময়ে পড়া সংকটের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দাবী বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নির্ধারণে নেই তোড়জোড়। দলটি রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে নেই প্রায় সাড়ে তিন বছর। বরং আগামী দিনে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বৃহৎ আন্দোলনের সক্ষমতাও যেন বিএনপি হারিয়ে ফেলেছে এমন আলোচনাই এখন সর্বত্র। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারাও এখন পিছিয়ে নেই। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন, সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে আগামীতে ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থন, দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব, কূটনৈতিক সহানুভূতি এবং নির্বাচনকালীন একটি সহায়ক সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা জোরদার করা হচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতেই চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডন গিয়েছেন। দেশে ফিরেই পরিকল্পনা মোতাবেক দলকে নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছুবেন বলে শীর্ষ নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে দলের একটি ক্ষুদ্র অংশ সংস্কারের আওয়াজ তুলে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর দলটি প্রথম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের ভরাডুবিতে বিএনপির সাংগঠনিক ব্যর্থতা শুরু হয়। দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে পরের বছর ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও লাঘব হয়। এর পরপরই শুরু হয় দেশব্যাপী তৃণমূল পুনর্গঠন। তা শেষ না হতেই চলে আসে দশম সংসদ নির্বাচন।

ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিহতেরও চেষ্টা চালায় বিএনপি। কিন্তু দলের সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় নির্বাচন আটকাতে পারেনি দলটি। প্রতিবাদস্বরূপ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ‘টানা অবরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা দিলেও ৯৩ দিনের বেশি তা চালাতে পারেনি। এরপর থেকেই টানা সাড়ে তিন বছর আন্দোলন থেকে দূরে সরে গিয়ে দলকে সুসংগঠিত করতে মনোযোগী হয় বিএনপি। এ সময়ের মধ্যে দল পুনর্গঠনে সাংগঠনিক কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বস্তুত আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোড়ালোভাবে আন্দোল-কর্মসূচি দিচ্ছে না দলটি।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে শুধু কর্মসূচি দিলেই ফল আসবে এমনটা অবশ্যই আমরা মনে করি না। সরকারবিরোধী আন্দোলনে গতি ফেরাতে দলকে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চালনের জন্য বর্তমানে সারাদেশে সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলছে বিএনপির। চেয়ারপারসন লন্ডন থেকে ফিরেই ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার’ প্রস্তাবনা ঘোষণা করবেন। এর পরপরই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝে ‘সহায়ক সরকার’ দাবি বাস্তবায়নে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, জনসমর্থনের বিষয়টিতে বিএনপির বর্তমান অবস্থা বেশ ভালো। টানা সাড়ে আট বছর বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকলেও জনপ্রিয়তা সেভাবে হ্রাস পায়নি। এ সময়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য দু’বার জাতীয় কাউন্সিল করা হয়েছে। তৃণমূল পুনর্গঠন রয়েছে শেষ পর্যায়ে। অপরদিকে বিএনপির জনসমর্থন বা নির্বাচনী ভোট ব্যাংক রয়েছে প্রায় ৪০ ভাগ। আগামী নির্বাচনেও তা ধরে রাখতে নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

নেতারা আরও জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিএনপির কূটনৈতিক সম্পর্ক আগে থেকেই ভাল। যে কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচন বন্ধে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ ছিল তখনকার সরকারের ওপর। তারা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেছিল সরকারকে। যদিও সরকার তখন তাদের কোনো পরামর্র্র্শ কর্নপাত করেনি। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে পিছিয়ে থাকায় সেসময় ‘একতরফা’ নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি বিএনপি। তাই এবার আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিবেশী দেশ ভারতই বড় ‘ফ্যাক্টর’ বিগত দিন থেকে এমন শিক্ষা নিয়ে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে যাচ্ছে বিএনপি।

এজন্য দেশটির লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুিবর পর থেকেই বিজেপি সরকারের সঙ্গে ‘দহররম মহররম’ সম্পর্ক তৈরিতে দলের সাবেক কূটনৈতিক সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে সরকারকে ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার’ প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফিরেই তা ঘোষণা করবেন। যা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং আন্দোলনে সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যাবে বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দেশে ফিরে শেষ সপ্তাহে অথবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রস্তাব ঘোষণা করার কথা রয়েছে খালেদা জিয়ার। মূলত এর পরেই জনগণ ও সুধীসমাজের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং আলোচনার পথ খুলবে বলে মনে করছে নেতারা। কারণ এর আগে গত ১০ মে খালেদা জিয়া ঘোষিত রুপকল্প ‘ভিশন ২০৩০’ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। রুপকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টিকে রাজনীতিতে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

কিন্তু ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০৩০’ বা অপেক্ষমাণ ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার’ প্রস্তাবনা থেকে কার্যকর ফলাফলের জন্য সাংগঠনিক শক্তি, গ্রহণযোগ্য কর্মসূচী এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে সরকারকে চাপে ফেলে সহায়ক সরকার দাবি আদায়ে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আর এ কারণেই চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডন গিয়েছেন। সেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি বসবাসরত বড় ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সার্বিক বিষয়াদি নিয়ে সার্বিক আলাপ-আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন বলে জানান দলের শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির নেতৃত্বের হয়তো কিছু ব্যর্থতা থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগবিরোধী বিকল্প আরেকটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান না হওয়া পর্যন্ত জনগণের বড় একটি অংশ বিএনপিকে সমর্থন করবে। ফলে দলটির আন্দোলন সক্ষমতা নেই এ কথা বলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি সব সময়ই জনগণের হয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াবে। আর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই আমরা সহায়ক সরকারের প্রস্তাব ঘোষণা করব এবং আন্দোলনের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়নও করব।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মনে হতে পারে বিএনপি আন্দোলন করতে পারছে না। কিংবা আন্তর্জাতিক সমর্থন না থাকার কথাও কেউ কেউ বলতে পারেন। কিন্তু দলটির ব্যাপক জনসমর্থনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, গত প্রায় ১০ বছরে মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় বর্তমানে বিএনপিকে বাহ্যিকভাবে দুর্বল একটি রাজনৈতিক দল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু সকলের অংশগ্রহণে ন্যূনতম সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও এ দলকে ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব, এটি ক্ষমতাসীনরাও জানে। তাই শেষ পর্যন্ত তাদেরও বোধোদয় হবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

ভোরের পাতা/ই

রাজনীতি | আরো খবর