বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা কই?

বৃহস্পতিবার , ০৫ জানুয়ারী ২০১৭, ৯:১৫ অপরাহ্ন

:: প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ ::

‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।
আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকার পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।
বাবুই হেসে কহে সন্দেহ কি তাই।
কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক তবু, ভাই পরের বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।’

কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী এ কবিতা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তালগাছের মাথায় বাবুই পাখির শত শত বাসা ঝুলে থাকার দৃশ্য আর তাদের চিরচেনা কিচির-মিচির। বাবুই পাখির বাসা দেখতে উল্টানো কলসির মতো। বাসা বানানোর জন্য এরা খুবই পরিশ্রম করে। এরা ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ সারায়। যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে (পালিশ করে) গোল অবয়ব মসৃণ করে। শুরুতে দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকে। পরে একদিক বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা করা হয়।

অন্যদিকটি লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ হয়। রাতে বাসায় আলো জ্বালার জন্য বাবুই জোনাকী ধরে আনে। বাবুইয়ের বাসা করার জন্য প্রয়োজন হয় নলখাগড়া ও হোগলা। কিন্তু দেশে নল ও হোগলার বন কমে যাওয়ায় বাবুইদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বাবুই পাখি খুব সুন্দর বাসা বোনে, তাই এরা ‘তাঁতি পাখি’ নামেও পরিচিত।

বাংলাদেশে তিন ধরনের বাবুই দেখা যায়: দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই। বাংলাদেশে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে, তবে দেশি বাবুই এখনো দেশের সব গ্রামের তাল, নারিকেল, খেজুর, রেইনট্রি গাছে দল বেঁধে বাসা বোনে। এরা সাধারণত মানুষের কাছাকাছি বসবাস করে, তাই দেখা যায় এদের বাসা মানুষের হাতের নাগালের মাত্র পাঁচ অথবা ছয় ফুট ওপরে। এরা মূলত বীজভোজী। এদের ঠোঁটের আকৃতি চোঙাকার আর গোড়ায় মোটা। অধিকাংশ বাবুই প্রজাতির আবাস সাব-সাহারান আফ্রিকায়, তবে কয়েকটি প্রজাতি এশিয়ায় স্থায়ী।

গোপালগেঞ্জর বিভিন্ন গ্রামের রাস্তার ধারে, পুকুর কিংবা নদীর পারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি তাল গাছেই এক সময় বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত। দৃষ্টিনন্দন সেই বাসা তৈরিতে ব্যস্ত থাকত বাবুই পাখিগুলো। কিন্তু এখন গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামগুলোতে তালগাছ বিলুপ্তপ্রায়। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখিও। এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছের পাতায় এখন আর দেখা যায় না বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসাও।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ডুমদিয়া গ্রামের মামুন গাজীর পুকুর পাড়ের তালগাছে বেঁধেছে বাবুই পাখির চিরচেনা সেই বাসা। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মানুষের মনে বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রশান্তি মেলে। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী সারি সারি তালগাছ। আর সেই গাছের ওপর দেখা যেত শিল্পমনা বাবুই পাখির আপন মনে বাসা তৈরির দৃশ্য।

একই গ্রামের সাইফুর রহমান বলেন, এক সময় আমাদের এই গ্রামে অনেক তালগাছ দেখা যেত, আর তাতে ছিল বাবুই পাখির বাসা। অনেক ভালো লাগত সেই দৃশ্য দেখে। বর্তমানে তালগাছ কেটে এখন সবাই ফল আর কাঠের গাছ রোপণ করছে আর তাই তালগাছের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি ও তার বাসা।

 

ভোরের পাতা/ই

WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.
WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.