সিটিজেন জারনালিজম
শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭ ৩ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে……

:: ভোরের পাতা অনলাইন :: 

আজ ৪ জানুয়ারি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শুধু একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন নয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি প্রয়াস, একটি স্বপ্ন, একটি চেতনা, একটি আলোকবর্তিকা, একটি নিরন্তর সংগ্রাম। দেশ বিভাগের পর সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রূপ প্রকট আকার ধারণ করে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পূর্বাঞ্চলের মানুষের প্রগতিশীলতার পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া ভাষার বৈষম্য বাঙালির জীবনে দুর্বিসহ পরিণতি বয়ে আনে। সেই চরম নিপীড়নমূলক পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতার প্রেতাত্মাকে পরাভূত করার লক্ষ্যে এবং ভাষার আন্দোলনকে রাজনৈতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জন্ম হয়।

সব অন্যায় ও অসঙ্গতির বিপক্ষে এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, দেশপ্রেমে নিমগ্ন যৌবনোদীপ্ত শেখ মুজিব তাঁর জীবন ও যৌবনের সবটুকু উত্তাপ দিয়ে গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ থেকে ২০১৭ এই সুদীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যেন কবি কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ‘দেশের তরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিবো অকাতরে’ এমনই অলিখিত ও অনুচ্চারিত শপথে দীপ্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী।

প্রতিষ্ঠার পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সমাজ ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ পূর্ববাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীনকে বাধ্য করেছিল বাংলাকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে, কিন্তু ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি সেই নাজিমউদ্দিনই পল্টনে মুসলিম লীগের এক জনসভায় বলল, ‘পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ না, না বলে সমস্বরে আওয়াজ তোলে এবং রাজপথে নেমে আসে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ছাত্ররা যে ধর্মঘট ডেকেছিল সেই ধর্মঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কয়েকজন সহকর্মীসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে জেল-জুলুম তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। তিনি জেলের মধ্যে থেকেই সার্বিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগ যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে সরব প্রচারণায় মাঠে নেমেছিল। যার ফলে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। ’৫৪-এর নির্বাচনে ছাত্রলীগের কয়েক নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মুসলিম লীগের হেভিওয়েট নেতাদের লজ্জাজনকভাবে পরাজিত করে।

শিক্ষা, শান্তি আর প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ ১৯৬২ সালে শরিফ কমিশনের বিরুদ্ধে গগনবিদারী প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কেননা, বিতর্কিত শরিফ কমিশন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। সেই আন্দোলনে ছাত্রলীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গণআন্দোলন ও গণজাগরণ সৃষ্টি করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত ৬-দফা হচ্ছে বাংলার স্বাধীনতার প্রথম স্মারক। আর এই ৬-দফার অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নকল্পে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালের ১৩ এপ্রিল করাচি থেকে ফিরেই বঙ্গবন্ধু সর্বাগ্রে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে মুসলিম লীগ থেকে আগত আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে ছাত্রলীগের তরুণ নেতাদের জেলায় জেলায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার নির্দেশ দেন এবং ৬-দফার ব্যাপক প্রচারণার নির্দেশ দেন।

১৯৬৮ সালে বাংলা ভাষার অক্ষুণ্ণতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে আবারও স্বোচ্চার হতে হয়। ’৬৮-এর ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার নজরুল একাডেমিতে এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানের আন্তঃভাষা সমন্বয়ে একটি জাতীয় পাকিস্তানি ভাষা সৃষ্টির আহ্বান জানালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাংলাকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পাল্টা প্রস্তাব দেয়। ফলে আইয়ুব খান পিছু হটে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ বাঙালি রাজনীতিক, সামরিক অফিসার ও অন্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের ও তার বিচার প্রক্রিয়া শুরুর ঘটনা, পূর্বাঞ্চলের প্রতি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বঞ্চনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা ভাষার তথাকথিত সংস্কারের পুনঃপ্রচেষ্টা, বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সাধারণ ছাত্র ও জনতার সমন্বয়ে ১৯৬৯ সালে ঢাকার রাজপথ গণ-আন্দোলনের উত্তাল মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ১১-দফার প্রস্তাব দেয়া হয় সেই গণঅভ্যুত্থান থেকে। মূলত বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও একটি সাধারণ নির্বাচন ছাত্রলীগের ১১-দফারই সফলতা।

১৯৭১, আমাদের সংগ্রামের পর্ব, আমাদের মুক্তির পর্ব। স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের যুদ্ধে আমাদের উৎসর্গ করতে হয়েছে ত্রিশ লাখ জীবন ও আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার নির্দেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বই-খাতা-কলম ফেলে হাতে তুলে নিয়েছিল থ্রি নট থ্রি, এসএলআর, এলএমজি, এইচএমজি, এম-২ স্টেনগান। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পড়ুয়া আমাদের অগ্রজরা যাদের নিয়মিত পদচারণায় মুখরিত ছিল সবুজ, শ্যামল, পত্র-পুষ্প শোভিত শিক্ষাঙ্গন, তাঁরা যখন অস্ত্র হাতে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তখন কবি মহাদেব সাহার লাইনগুলোই হয়তো সবচেয়ে বেশি বাস্তব ছিল-

কতোদিন কোথাও ফোটে না ফুল/ দেখি শুধু অস্ত্রের উল্লাস/ দেখি মার্চপাস্ট, লেফট রাইট, কুচকাওয়াজ /স্বর্ণচাঁপার বদলে দেখি মাথা উঁচু করে আছে হেলমেট/ ফুলের কুঁড়ির কোনো চিহ্ন নেই/ গাছের আড়ালে থেকে উঁকি দেয় চকচকে নল/ যেখানে ফুটতো ঠিক জুঁই, বেলি, রঙিন গোলাপ/ এখন সেখানে দেখি শোভা পাচ্ছে বারুদ ও বুলেট।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগ সতের হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীকে হারিয়েছে। একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য সে দেশের কোনো ছাত্র সংগঠনের এত নেতাকর্মী জীবন দিয়েছে বলে ইতিহাস নেই। জীবন দানের এ ইতিহাস শুধু আমাদের। এ আত্মত্যাগ আমাদের গর্ব। এ আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রেরণা।

জন্মলগ্ন থেকে মুক্তিযুদ্ধপর্ব সময়টা ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল অতীত হিসেবেই অবিহিত আর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে অদ্যবধি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ পর্ব। এই সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জন্য দুর্গম ও বন্ধুর ছিল এবং আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির ভাগ্যাকাশে এক কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়। বাঙালি জাতি হারায় পিতাকে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ হারায় সর্বস্ব। পিতা হারানো এতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক চোখে অশ্রু আর এক চোখে প্রতিশোধের আগুন নিয়ে সুসংগঠিত হতে চেষ্টা করে। ১৯৮১ সালে দেশরত্ন  শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রিয় নেত্রীর ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করে। নেত্রীকে সুরক্ষিত রেখে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন, একটি যুগান্তকারী শিক্ষা নীতি প্রণয়নের আন্দোলন, ক্যাম্পাসগুলোতে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে বসা ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টি ও ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ের আনার সংগ্রাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ লেখাপড়ার পাশাপাশি জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশে ফিরে এনে বিচারের দাবিতে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের দাবিতে গণজাগরণ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ইতিহাস বিকৃতি, ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে সদা জাগ্রত ও স্বোচ্চার।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাঙালি জাতির কাছে রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, নৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতি একটি সংগঠন। ইতিহাস এই প্রতিশ্রুতি সৃষ্টি করেছে। তাই তো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ায়, শীতার্তদের পাশে দাঁড়ায় মানবতার জয়গানে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রগতিশীল ও মেধাবী সন্তানদের সংগঠন। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা যে ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ শুরু করেছেন সেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ইতিবাচক ভূমিকা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ সফল করতে বিপুল কর্মস্পৃহা এখন ছাত্রলীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীর মাঝে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার গর্বিত অংশীদার হবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বঙ্গবন্ধু একটি আলো, এই আলো প্রত্যেকের হৃদয়ে প্রজ্বলিত হোক, অহর্নিশ এই প্রত্যাশাই করি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হোক, সার্থক হোক।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: শেখ ফয়সল আমীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সিটিজেন জারনালিজম | আরো খবর