জাতীয়
শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭ ৩ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

কেরানীগঞ্জে নাজিমুদ্দিন রোগ

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

২২৮ বছরের পুরনো নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার গত বছরের ২৯ জুলাইয়ে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত হয় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বন্দীসহ।

এর আগে ১০ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে কারাগারের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারাগারটি সরেছে যেমন তেমনি করে সরেছে দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎবাণিজ্য, বন্দীবাণিজ্য, মাদকবাণিজ্য এবং কারাগারে মোবাইল ব্যবহারের অবৈধ প্রক্রিয়া। একই থেকে গেছে এসব অপকর্মে জেল পুলিশ, জমাদার, কারারক্ষী ও কিছু সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীর সম্পৃক্ততা। চলতি মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বেশ গর্বের সঙ্গে ভোরের পাতাকে বলেন, সেলে বইসাই টাকা দিয়া মোবাইলে কথা কইছি। ১০ হাজার টাকা লাগছে। সমস্যা হয় নাই। তবে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ভোরের পাতাকে বলেছেন, কিছু অনিয়ম থাকতে পারে তবে মাদকবাণিজ্য অথবা মোবাইল ব্যবহার করার প্রশ্ন নেই।

সাক্ষাৎ ও সেল বাণিজ্য : নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ করতে গিয়ে হেনস্থা এবং অর্থ প্রদানের ঘটনার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে। ভেতরে যেতেই একজন হাজতি কয়েদীর অধীনে চলে যান অলিখিতভাবে। সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা কয়েদী বলে বিবেচিত। এক কয়েদী আরেক কয়েদীর কাছ থেকে বন্দী কিনে নেন। কয়েদীকে বুঝিয়ে দিতে হয় ২৫০০ টাকা। পাশাপাশি ভালো বিছানার জন্য রয়েছে আলাদা মূল্য। না হলে ইলিশ ফাইল অথবা কেচকি ফাইলের নির্মমতায় পড়তে হয়। সাক্ষাৎবাণিজ্যের মূল কুশীলব কারারক্ষীরা।

কেরানীগঞ্জে কারাগার স্থানান্তরিত হওয়াতে কারারক্ষীদেও যেন পোয়াবারো হয়েছে। মূল ফটক থেকে শুরু করে মাঠে, ঝোপেঝাড়ে চলে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে তাদের দেন-দরবার। সঙ্গে দালালরাতো রয়েছেই। কারাগারের সামনে মাঠে বেঞ্চে বসে সাক্ষাৎপ্রত্যাশীদের নাম-ঠিকানা লিখতে হয়। এই লেখালেখি হয় খুব ধীরে। এর মধ্যে চলে সমস্ত প্রক্রিয়া। নাম না জানানোর শর্তে দুই কারারক্ষী চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে জানান, কারাগারের সাক্ষাৎকক্ষ মাসওয়ারী ৫০-৬০ হাজার টাকায় ইজারায় যায়।

প্রতিদিন গড়ে ১২০০’র মতো সাক্ষাৎপ্রার্থী আসেন কারাগারে। পরে যে লাভ হয় তা ভাগ করে নেন চার কারারক্ষী। এদিকে কারাগারে একটু ভালো বিছানা বা শীতের সময় কম্বল পেতেও চলে বাণিজ্য। ১০, ৯০, ১৪ এবং ২৬ সেলে জায়গা পেতে কয়েদীদের দিতে হয় ৫০০০ টাকা। যার দেখভাল করে কয়েদী মুক্তার ও পিচ্চি সুমন। এসব টাকার ভাগ জেলার পর্যন্ত চলে যায়। টাকা দিয়ে সুযোগ নেয়া প্রসঙ্গে কয়েকজন হাজতি ও কয়েদীর স্বজন ভোরের পাতাকে বলেন, এছাড়া কথা বলাতো দূরের কথা, ছায়াটাও দেখতে পাই না। দেখলে মনটা ভালো হয়।

মাদকবাণিজ্য : কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই চলছে হাজতি কিংবা কয়েদীদের মাদকবাণিজ্য। সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের কারাগারে কয়েদী বলা হয়। আর যারা বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকে তাদের হাজতি বলা হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারে চমকপ্রদ হলেও সত্য চলছে রমরমা মাদকবাণিজ্য। যা চলছে ৬ মামলার সাজাপ্রাপ্ত পুরান ঢাকার কয়েদী ফয়সালের নেতৃত্বে। এছাড়া হাজতি বাসাবোর রাশেদ, রিপনও এই মাদকবাণিজ্যে জড়িত বলে সূত্র জানায়। জেলপুলিশের একটি অংশ এই মাদকবাণিজ্য চালাতে কয়েদী ও হাজতিদের সহায়তা করছে বলে জানা যায়।

কারাগারে মোবাইল ব্যবহার এবং… : কারাগারের সেলগুলোতে চলতে জমাদার এবং কারারক্ষীদের সহায়তায়। লালবাগ স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা চলতি মাসে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছেন। তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, ৯০ সেলে বসে মোবাইল ব্যবহার করেছি নিয়মিত। ১০ হাজার টাকা খরচ হইছে। ঝামেলা হয় নাই। কারাগারের জ্যামার থাকলেও রাতে জমাদার, কারারক্ষীরা জ্যামারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন বলে তথ্য দেন তিনি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে কারাগারে মোবাইল ব্যবহারের তথ্যের সত্যতা মিলেছে। একে কারাগারে অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কয়েদীদের মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কারারক্ষীদের সহায়তায় এই অপরাধ সংঘটিত হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এছাড়া সাক্ষাৎবাণিজ্য ও অবৈধভাবে কারাগারে কয়েদীদের কাছে টাকা পাঠানোকেও সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়। কয়েদীদের মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভেতরে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের সহায়তায় মুঠোফোনে কথা বলেন বন্দীরা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। দেওয়া হয় রসিদ। যদিও এর কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। সেই প্রতিবেদনে জানানো হয় এমন কাজের সঙ্গে চার কারারক্ষীর সম্পৃক্ততা সাপেক্ষে তাদের বিভিন্ন কারাগারে বদলি করা হয়েছে। অথচ সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে দর্শনার্থী ফি বাবদ ২০০ টাকা নেওয়ার সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রসিদের মাধ্যমে কারা অভ্যন্তরে টাকা পাঠানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এদিকে এক কারারক্ষী ভোরের পাতাকে তিন জমাদার মিন্টু লাল, মোতালেব ও সিরাজের নাম জানান। যারা বন্দী, সাক্ষাৎ এবং মোবাইল ব্যবহার বাণিজ্যে জড়িত। এই কারাসূত্র রেজাউল, নাজমূল, হারুন ও পিন্টু নামের চার কাররক্ষীর নামও বলেন। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির ভোরের পাতাকে বলেন, নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে এমন কিছু সমস্যা থাকলেও এখানে তা নেই। আর মাদকবাণিজ্য বা মোবাইল ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না।

 

অনলাইন/কে

জাতীয় | আরো খবর