একুশের চেতনা এবং বর্তমান প্রজন্ম

শুক্রবার , ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ৯:০৯ অপরাহ্ন

:: মো. দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা ::

একুশ বাঙালি জাতীয় জীবনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম। একটি রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ভাষা, সংস্কৃতি, ভূখন্ড, চেতনার ঐক্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তবে তার মধ্যে ভাষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি বা জাতিকে একত্রিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মাতৃভাষা। জীবনবোধ ও জীবনাচরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠ এই ভাষা। ভাষা ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষ এমন একটি শক্তি যা নিরপেক্ষ জাতি গঠনে বা রাষ্ট্রগঠনে সহায়ক। মাতৃভাষা যেমন অধিকার আদায়ের সংগ্রামী প্রেরণা তেমনি কখনো কখনো হয়ে ওঠে মুক্তি সংগ্রামেরও প্রেরণা।

আমাদের বাংলা ভাষা আমাদের চেতনাকে শাণিত করেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর সাহস সঞ্চার করেছে আমাদের বাংলা ভাষা। ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট ভারত এবং পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনবোধের দিক থেকে মূলত তিনটি রাষ্ট্রেরই জন্ম হয়েছিলো। যা ধীরে ধীরে দৃষ্টিগোচর হতে পেরেছিল।

শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে সেদিন পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছিল খুব দ্রুতই তাদের সেই স্বপ্ন ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। চাকরি ক্ষেত্রে অবহেলিত, বর্ণ-বৈষম্যের শিকার হয়েছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। তাদের স্বপ্নে প্রথম পেরেক ঢুকিয়েছিল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ।

তিনি ভাষণে যখন বলেছেন “- শুধু মাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।” ঠিক তখনি উপস্থিত জনতার মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের শাসকেরা বাংলা ভাষা নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। তারা প্রস্তাব করেছিল বাংলা ভাষা লিখতে হবে আরবি হরফ দিয়ে। অর্থাৎ উচ্চারণ বাংলাই হবে কিন্তু লিখতে হবে আরবি হরফ দিয়ে। তখনকার শিক্ষিত প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে পূর্ব বাংলা ধর্মীয় কারণে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত লাভ করে। শুরু থেকেই বিভিন্ন ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা বঞ্চিত হতেছিল কিন্তু যখনই তারা বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানার চেষ্টা করলো ঠিক তখনই শিক্ষিত ছাত্রসমাজ তথা ছাত্রলীগ দাঁতভাঙা জবাব দিতে থাকে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম ধাপটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এসে এই আন্দোলন চূড়ান্তরুপ লাভ করে।

একুশের ভাষা আন্দোলন মুলত চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল তা হলো রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। একুশের ফেব্রুয়ারির স্লোগান ছিল ‘ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘ শহীদ স্মৃতি অমর হোক’, এবং ‘সকলস্তরে বাংলা চালু কর’। মুলত এই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি যে সাহস সঞ্চার করেছিল তা পরবর্তী প্রজন্মকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তাই ভাষা আন্দোলনই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার প্রথম স্তর, এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র সাধারণ নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

তাই একুশের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একইসূত্রে গাথা। যারা একুশের চেতনা লালন করেছিল তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যুক্ত ছিল আর যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যুক্ত ছিল তারা বর্তমানে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত। দেশের জনগণের একটা বৃহৎ অংশ তাদের সাথে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাম ঘরানার রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এই চেতনাগুলোর সাথে সম্পৃক্ত।

একুশের চেতনা মুলত ছিল চাকরী ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো, শিক্ষার মান বৃদ্ধি, অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সম-অধিকার, সকল স্তরে বাংলা ভাষা চালু, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা,গভীরভাবে হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালবাসা, কোন অপ-সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা করা এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত রাখা।

আর এ কারণেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি ভঙ্গ করে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউর আরও নাম না জানা অনেকে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। যার কারণে বাংলা ভাষা শুধু আমাদের অহংকারই নয় বাংলা ভাষা আজ সারা বিশ্বের অহংকার, পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা। এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে!

একুশের চেতনার সাথে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কঃ

আমি এটাকে দুভাগে ভাগ করতে পারি একটা পজিটিভ সম্পর্ক অন্যটি নেগেটিভ সম্পর্ক।

নেগেটিভ সম্পর্কঃ আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশই দেশপ্রেম, একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি তারা বোঝে না। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এবং ইংরেজী মাধ্যম লেখাপড়া করা তরুণদের মধ্যে এটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা হিন্দী আর আধা ভাঙ্গা ইংরেজী বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। এমনকি তাদের সামনে কোন শিক্ষিত তরুণ বাংলা বললে তাকে ক্ষ্যাত বলে বাজে শব্দটিও ব্যবহার করে। উৎশৃঙ্খল জীবন যাপন যাদের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি কি,বঙ্গবন্ধুকে, মুক্তযুদ্ধ কি, বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবস বিষয়ে তাদের কোন ধারণা নেই। আর জন্য তার পরিবার দায়ী। বিশেষ করে তাদের মা। কারণ দেশপ্রেম শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পরিবার। কিন্তু তাদের বাবা- মা তাদের সে শিক্ষা না দিয়ে ছোট বেলা হিন্দী সিরিয়াল দেখিয়েছেন, ইংরেজী শিখিয়েছেন আর বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছেন। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমাদের তরুণ সমাজের একটা অংশ।

পজিটিভ সম্পর্কঃ যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে শিক্ষিত নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটা বৃহৎ অংশ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, রাজনৈতিক সচেতন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এরাই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বাংলা ভাষা কি, এর গভীরতা, মুক্তিযুদ্ধ কি, এর গভীরতা অনুধাবন করার চেষ্টা করে,বুকের ভিতর লালন করে একটি বড় স্বপ্ন কি ভাবে এই দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা যায়। দেশের যে কোন ক্রান্তিকালে তারাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশেষ করে আমরা যারা এই প্রজন্মের তরুণ সমাজ আমরা রাজনৈতিক সচেতন, আমরা একুশের চেতনায় বিশ্বাসী,মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। আমাদের আছে দেশরত্ন শেখ হাসিনা। আমাদের ভয় কিসের? আমরা নির্ভয়।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু কথাঃ

শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলায় কথা বলবো এবং নির্ভুল বাংলা লিখবো। আমাদের সাইনবোর্ডগুলো শুদ্ধ বাংলায় লিখবো, নামফলকগুলো হবে শুদ্ধ বাংলায়, রাস্তার দুপাশে দোকান-পাঠ, অফিস আদালতের ঠিকানা শুদ্ধ বাংলায় লিখবো।আমরা সব ভাষার সম্মান দেখাবো। একুশের মুল শক্তি মাটি,মানুষ,ভাষা ও ভাষার প্রতি ভালবাসা সেদিকে খেয়াল রাখবো।

লেখালেখি,বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, শুদ্ধ সংস্কৃতিক চর্চা, শিল্প চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে বিকষিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলা একটি অত্যন্ত প্রবল ভাষা তাই অন্য ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। শেকড়কে ঠিক রেখে আমরাও সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আমাদের ভিতর জেগে উঠুক বাংলা ভাষা প্রেম।

লেখকঃ দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

 

অনলাইন/কে 

WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.
WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.