অতিথি পাখি শিকারের মহোৎসব

বৃহস্পতিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ১২:২৭ অপরাহ্ন

:: সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ::

দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রামসার সাইট ও মাদার ফিসারিজ খ্যাত সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার টাঙ্গুয়ার হাওরের নিরাপত্তার কাজে থাকা পুলিশ ও আনসারদের ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে চুরি করে মাছ ধরা ও অতিথি পাখি শিকার অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ মাছ ধরা ও পাখি শিকার নিয়ে পুলিশ ও আনসারা উধ্বর্তন কতৃপক্ষেকে শুভঙ্ক ফাঁকি দিয়ে জেলে ও পাখি শিকারীদের নিকট থেকে উপরী আয়ে ফুলে ফেসে উছেন। মুলত জেলা প্রশাসনর তত্বাবধানে থাকা এই হাওরটিকে পুলিশ ও আনসারাই দু’হাতে লুটেপুটে খাচ্ছেন।’

সরজমিনে গেলে হাওর পাড়ের লোকজন জানান, সর্বশেষ রবিবার গভীর রাতে দু ’দল চুরি করে টাঙ্গুয়ার হাওরের আলম ডুয়ার নামক জলমহালে মাছ ধরতে গেলে সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের জেলেরা লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে পানিতে ফেলে মুসাব্বির মিয়া নামের এক বৃদ্ধ জেলেকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

এ ঘটনার অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে অনেকটা থলের বিড়াল বের হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। বুধবার হাওর তীরবর্তী একাধিক গ্রাম বাসীর সাথে আলপকালে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবাধে মাছ ও পাখি শিকার করার ধান্দা অব্যাহত রাখতে গিয়ে থানার ওসিকে ম্যানেজ করে জেলে হত্যার বিষয়টি ধামাচাঁপা দেয়া হয়েছে। ওই জেলে হত্যাকান্ডের পর থেকেই ওসি ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা জেলে পানিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করতে থাকেন।

তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন সংরক্ষিত হাওরে দুই দলের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় মামলা হলে অনেকেই হাওর লুটের ভাগ থেকে বঞ্চিত হবেন এমনকি গোমড় ফাঁস হয়ে যাবার আপবাদ থেকে রক্ষা পেতেই এই কৌশল নিয়েছেন।

২০০৩ সালে জেলা প্রশাসনের নিরাপক্তা তদারকি ও একটি বেসরকারি এনজিও সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৫৩টি জলমহালের প্রায় ১০ হাজারর হেক্টর আয়তনের সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে গভীর রাতে উৎকোচের বিনিময়ে শতশত জেলে মাছ ধরা ও পাখি শিকারীদের ও অথিথি পাখি নিধনের সুযোগ করে দিয়ে যখন যে ওসি ও আনসারগণ দায়িত্ব পালনে করেছেন তখনই তারা দু’হাতে লুটেপুটে নিজেদের পকেট ভাড়ি করেছেন।

টাঙ্গুয়ার হাওরের মূল গভীর জলাশয় এলাকায় তাহিরপুর থানার টেকেরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য ও কয়েকটি আনসার ক্যাম্প থাকার পরও চুরি করে মাছ শিকারের ঘটনায় দু’দল জেলের সংঘর্ষে এক জন মারা যাওয়ায় ঘটনায় হাওরটি অরক্ষিত ও উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন, পরিবেশবাদী সংগঠনের লোকজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও এলাকার জনপ্রতিনিধিগণ।’

চলতি সপ্তাহে টাঙ্গুয়ার হাওরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সম্রাট খীসা বলেন,‘হাওরে প্রতি রাতেই মাছ ধরা হয় এমন অভিযোগ ঠিক নয়। রবিবার রাতে হাওরের ভেতরে হতাহতের কোন ধরনের ঘটনা ঘটেনি। মুসাব্বির মিয়া নামের ওই জেলে পানিতে পড়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে।’

২ ফেব্রুয়ারী টাঙ্গুয়ার হাওরে অবৈধভাবে ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি শিকারের দায়ে উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের মেন্দিআতা গ্রামের শাহানুরের দুই ছেলে এমরান মিয়া ও তার ছোট ভাই রব্বানী মিয়াকে ৬ মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড- দিয়েছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামসার প্রকল্পভুক্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদারকিতে চলছে। কিন্তু অভিযোগ, হাওরের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বহনকারী নৌকার মাঝি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বখরা দিয়ে প্রতি রাতেই চলে অবৈধভাবে মাছ ও অতিথি পাখি শিকার।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাওরে অভিযানে যাবার আগেই পুলিশ, আনসার ও নৌকার মাঝিরাই মুঠোফোনে সংকেত পাঠিয়ে দিলে বন ঝোপঝাড়ে কিছুক্ষণ আত্বগোপন করে থাকার পর ম্যাজিষ্ট্রে ফিরে আসার সাথে সাথেই শুরু হয় তাদের কর্মযজ্ঞ।

মাঝে মাধে দু’একজন মাছ ও পাখি শিকারী ধরা পড়লে কিছু জাল, নৌকা ও পাখি আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে লঘু দন্ড ও জড়িমানা আদায় করা হয়। কিন্তু কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না মাছ ও পাখি শিকার। হাওরের এলাকার হাটবাজারের পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় ও রাজধানী ঢাকাতেও অতিথি পাখি ও মাছের চালান যাচ্ছে বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের একাধিক বাসিন্দা জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের মাজিস্ট্রেটের নৌকার মাঝি, আনসার ও পুলিশ সদস্যদের টাকা দিয়েই রাতে অতিথি পাখি ও মাছ ধরা হয়। রাতে চুরি করে পাখি ও মাছ ধরতে ধরতেই হাওরের ৫৩টি জলমহালই এখন মাছ ও পাখি শুন্য হয়ে পড়ছে। এক সময় ইজারাদারী প্রথায় শুধু মাত্র আলম ডুয়ারে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার মাছ ও পাখি বিক্রি হতো।

জানা যায়, ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি ইরানের এক সম্মেলনে এ হাওরকে রামসার এলাকাভুক্ত করা হয়। ২০০৩ সালের নভেম্বর থেকে ৭০ বছরের ইজারা প্রথা বাতিল করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হাওরের জীব বৈচিত্র রক্ষা ও রামসার নীতি বাস্তবায়ন লক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু গত ১৭ বছরেও টাঙ্গুয়ার হাওরে কোন পরিবেশগত উন্নয়ন হয়নি বরং উল্টো দাতা সংস্থা ও সরকারের কয়েক’শ কোটি টাকা নিরাপক্তা ও তদারকিতে ব্যায়ের নামে জলেই ঢালা হয়েছে। এছাড়াও হাওরের মাছ, গাছ পাখি লুটের কোটি কোটি টাকায় প্রশাসন ও এনজিও কর্তাব্যাক্তিরা ফুলে ফেপে উঠেছেন।

আমরা হাওরবাসীর সমন্বয়ক রুহুল আমিন ও পরিবেশ ও মানবাধিকার উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি সঞ্জিব তালুকদার টিটু বলেন,‘গত ১২-১৩ বছরে টাঙ্গুয়ার হাওরের উন্নয়নের নামে হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশসহ সবকিছুই ধ্বংস করা হয়েছে। পুরো হাওরটিই অরক্ষিত ও উন্মুক্ত।

স্থানীয়ভাবে যারা হাওর তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন তারাই অবৈধভাবে মাছ ও পাখি শিকারের সুযোগ করে দেন। চুরি করে মাছ শিকারের ঘটনায় সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে হয়েছে মামলা মোকদ্দমা। টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরা নিয়ে প্রতিপক্ষের আঘাতে এক জেলে হত্যার ঘটনা ঘটলেও থানার ওসি কী করে বিষয়টি ভিন্নখাতে নিয়েছেন এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’

তাহিরপুর থানার ওসি শ্রী নন্দন কান্তি ধর বুধবার তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রবিবার রাতে হাওরে একজন মারা গেছে খবর পেয়ে সোমবার সকালে খলাহাটি গ্রামে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। মুসাাব্বিরের পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন পানিতে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ওই রাতে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে মুসাব্বির মিয়ার ছেলে ও অন্য একটি ছেলে মারামারি করেছে।’

টাঙ্গুয়ার হাওরের চলতি সপ্তাহের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সম্রাট খীসা বলেন,‘ হাওরের ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কেউ মাছ ধরা ও পাখি শিকারের সাথে জড়িত নয়। নৌকার মাঝি, আনসার ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তথ্য পাচার ও জেলেদের সহায়তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

 

অনলাইন/এইচটি

WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.
WARNING: Assigned ad is expired! Extend the term or Delete it.